মিউকরমাইকোসিস – মানুষের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব

Reading Time: 4 minutes

লেখক পরিচিতিঃ ডঃশুভময় ব্যানার্জী, পি.এইচ.ডি June 26, 2021

মিউকরমাইকোসিস একটি ছত্রাকঘটিত সংক্রমণ। সম্প্রতি এই সংক্রমণের কথা খুব শোনা যাচ্ছে। যদিও এই ধরনের রোগ বিরল এবং ছোঁয়াচেয়ও নয় কিন্তু এই রোগে অসুস্থতাও মৃত্যুর হার অনেক বেশী বলে “মিউকরমাইকোসিস”  মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।

কোন রোগ বিরল প্রকৃতির হলে, সেই রোগের ওষুধ, ভ্যাকসিন বা চিকিৎসাপদ্ধতি বার করার জন্যে দরকারি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা সহজ হয় না। কারন, এই সব রোগের সংক্রমণ প্রকৃতি,  শনাক্তকরন এবং উপযোগী চিকিৎসা সবকিছুই নির্ভর করে রোগের কেস রিপোর্ট,  রোগীর সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের উপর। সেগুলি যথেষ্ট পরিমানে পাওয়া না গেলে সঠিকভাবে গবেষণা চালিয়ে তার কোন ওষুধ বা চিকিৎসা বার করা ভীষণ পরিশ্রমসাধ্য ও জটিল হয়ে পড়ে। সেকারনেই মিউকরমাইকোসিসের নির্দিষ্ট কোন রোগ নির্ণয় পদ্ধতি ও চিকিৎসা এখনো সঠিকভাবে বার করা সম্ভব হয়নি। এই প্রবন্ধে আমরা এই রোগের প্রকৃতি, রোগের উপসর্গ এবং কিভাবে মিউকরমাইকোসিস আমাদের স্বাস্থ্যের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে সেই সম্পর্কে জেনে নেবো।   

মিউকরমাইকোসিস রোগের জন্যে দায়ীকে? 

মিউকরমাইকোসিস রোগটি ছড়ায় মিউকরমাইসেটিস নামের ছত্রাক গোষ্ঠী। আমাদের চার পাশের পরিবেশেই এই ছত্রাক পাওয়াযায়। রাইজোপাস, মিউকর, রাইজোমিউকর, সিনসেফালাস্ট্রাম, অ্যাপোফাইসোমাইসিস ইত্যাদি প্রজাতির ছত্রাক এই গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে। ভারতে মিউকরমাইকোসিস করেরাইজোপাস প্রজাতির ছত্রাক। কিন্তু, অ্যাপোফাইসোমাইসিস এলিগ্যান্স  এবং অ্যাপোফাইসোমাইসিস   ভ্যারিয়াবিলিস  প্রজাতির সন্ধানও পাওয়া গেছে যারা মিউকরমাইকোসিসের জন্যে দায়ী। 

This image has an empty alt attribute; its file name is Masthead-1024x246.png

http://www.nchealthzon.com

কাদের মিউকরমাইকোসিস হয়?

নিম্নলিখিত মানুষদের মিউকরমাইকোসিস হয়ে থাকে।

  • উচ্চ মাত্রার ডায়াবেটিসে
  • ম্যালিগন্যান্ট টিউমার, ব্লাডক্যান্সার এবং এইডস হলে
  • অরগ্যান ও স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশান করা হলে
  • দীর্ঘদিন কোর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ ও ইমিউনো সাপ্রেশ্যান্ট ব্যাবহার করলে
  • শ্বেত-রক্তকণিকার স্বল্পতাজনিত রোগে বা নিউট্রোপেনিয়ায় 
  • ত্বকের সার্জারি হলে, ক্ষত, ঘা বা পুড়ে গেলে 
  • রুগ্ন, প্রি-ম্যাচিওর শিশুদের ক্ষেত্রে ইমিউনিটি কম হয়, তাদের মিউকরমাইকোসিস হবার সম্ভাবনা থাকে
  • সবে কোভিড-১৯ থেকে সেরে উঠেছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রে 

কিভাবে একজন মানুষ মিউকরমাইকোসিসে আক্রান্ত হয়?

এই ছত্রাক বাতাসে এবং পচা জৈবপদার্থ সমৃদ্ধ মাটিতে থাকে। উল্লেখ্য বিষয়হোল এই ছত্রাক বাতাসের চেয়ে মাটিতে এবং শীতের চেয়ে গ্রীষ্মকালে বেশী দেখা যায়। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে,  এই ছত্রাকের স্পোর বাতাসে ভেসে বেড়ায় এবং অতি-সহজেই নিঃশ্বাসের সাথে শরীরে প্রবেশ করে।  

যাদের ইমিউনিটি কম মিউকরমাইসেটিস তাদের দেহে পৌঁছে যথেষ্ট ক্ষতি করে। এইসব মানুষের গলা,  ফুসফুসে নিঃশ্বাসের সাথে স্পোর পৌঁছয় অথবা চামড়ার কোন ক্ষতের মধ্যে দিয়ে স্পোর শরীরে প্রবেশ করে।

কয় ধরনের মিউকরমাইকোসিস হতে পারে? 

  • পালমোনারিমিউকরমাইকোসিসঃ ক্যান্সার,  অরগ্যান ট্রান্সপ্লান্ট ও স্টেমসেল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশান রোগীদের এটি হতে পারে। এতে ফুসফুস আক্রান্ত হয়।
  • রাইনোসেরিব্রালমিউকরমাইকোসিসঃ ডায়াবেটিক ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে এমন রোগীদের এই সংক্রমণ হয়। ছত্রাক সাইনাসে প্রবেশ করে পরে মস্তিষ্কে পৌঁছে ক্ষতিসাধন করে। 
  • কিউটেনিয়াসমিউকরমাইকোসিসঃ কম ইমিউনিটির মানুষের এই সংক্রমণ হয়। 
  • গ্যাসট্রোইন্টেস্টিনালমিউকরমাইকোসিসঃ কম ইমিউনিটি যুক্ত প্রি-ম্যাচিওর শিশুদের এই রোগ হয়। 
  • ডিসেমিনেটেডমিউকরমাইকোসিসঃ অরগ্যান ট্রান্সপ্ল্যান্ট রোগীর ক্ষেত্রে ছত্রাক রক্তসংবহন পথে হৃদপিণ্ড, প্লীহা ইত্যাদি অঙ্গে এইধরনের সংক্রমণ ঘটে। 

মিউকরমাইকোসিসের উপসর্গ গুলি কিকি? 

  • পালমোনারি মিউকরমাইকোসিসঃ জর, কাশি, বুকে ব্যাথা ও শ্বাসকষ্ট। 
  • রাইনোসেরিব্রাল মিউকরমাইকোসিসঃ মুখের একদিকে ফোলাভাব, জর, মাথার যন্ত্রণা, নাক ও মুখে কালচে দাগ।
  • কিউটেনিয়াস মিউকরমাইকোসিসঃ দেহের বিভিন্ন স্থানে কালচে-লাল বর্ণের ঘা, ফোলাভাব, ব্যাথা ও যন্ত্রণা।  
  • গ্যাসট্রো-ইন্টেস্টিনাল মিউকরমাইকোসিসঃ পেটেব্যাথা, বমি এবং অন্ত্রে রক্তক্ষরণ। 
  • ডিসেমিনেটেড মিউকরমাইকোসিসঃ মস্তিষ্ক সংক্রমণের ফলে স্নায়বিক ও ব্যাবহার জনিত অস্বাভাবিকতা এমন কি কোমাও হতে পারে। 
  • এছাড়া, চিকিৎসকরা দেখেছেন নাক দিয়ে জলপড়া, চোখে ব্যাথা,  অন্ধত্ব ইত্যাদিও ব্ল্যাক-ফাঙ্গাসের উপসর্গ হতে পারে। 

কিভাবে মিউকরমাইকোসিসের উপসর্গগুলি কম করা যায়? 

এখনো এইরোগের কোন ভ্যাকসিন বার হয়নি। ফলে নিম্নলিখিত উপায়ে কিছুটা সংক্রমণ রোধকরা যেতে পারে।

১) কন্সট্রাকশান সাইটের ধোঁয়া-ধুলো এড়িয়ে চলতে হবে

২) জলেভেজা, শ্যাওলা পড়া ঘরে বসবাস করা উচিত নয়

৩) সর্বদা N-95 মাস্ক ব্যাবহার করতে হবে

৪) হাত-পা ঢাকা পোশাক পরতে হবে। পা-ঢাকা জুতো ব্যাবহার করা উচিত।

৫) বাগান, খামার, কৃষিজমি, জঙ্গলে কাজ করার সময়ে মাস্ক, উপযুক্ত পোশাক ও গ্লাভস অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। 

৬) কাজের পর প্রতিবার হাত-পা সাবান ও জল দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে। হাত অকারনে চোখে বা মুখে দেওয়া উচিত নয়। 

৭) ত্বকের ক্ষত, কাটা-ছেঁড়া, পোড়া বা কোন আঘাত এড়িয়ে চলে হবে।

8) ব্ল্যাক-ফাঙ্গাস সংক্রমণ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো অ্যান্টি-ফাঙ্গাল মেডিসিন ব্যাবহার করতে হবে।

কিভাবে মিউকরমাইকোসিস রোগনির্ণয় করা যায়?

  • চিকিৎসক রোগ উপসর্গ,  স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও মেডিক্যাল হিস্ট্রি দেখে মিউকরমাইকোসিস শনাক্ত করতে পারেন.
  • ফুসফুস বা ত্বকের ক্ষত থেকে তরল নমুনা সংগ্রহ করে, মাইক্রোস্কপিক পরীক্ষা করে  (হিসটোপ্যাথোলজি) বা নমুনার ফাঙ্গাল কালচার করে মিউকরমাইকোসিস ধরা যায়।
  • প্রয়োজনে সেরোলজিক্যাল টেস্ট, ELISA, ইমিউনো-ব্লট করা হয়। 
  • ফুসফুস, সাইনাস বা শরীরের অন্যান্য সংক্রমণের স্থানে সিটিস্ক্যান করা হয়।
  • পিইটি স্ক্যান, ম্যালডি-টফ এবং পিসিআর করেও মিউকরমাইকোসিস ধরা যায়। 
  • কোন-কোন ক্ষেত্রে বুকের এক্স-রে করে ও দেখা হয়।

মিউকরমাইকোসিসের চিকিৎসা কি ভাবে করা হয়?

  • যে কোন উপায়ে ফাঙ্গাল স্পোর এক্সপোজার কমিয়ে আনা হয়।
  • অ্যাম্ফোটেরিসিন-বি, পোসাকনাজল জাতীয় অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ড্রাগ ব্যাবহার করা হয়। 
  • সংক্রমণ খুব বেশী হলে সার্জারি করে সেই টিসু বাদ দিতে হয়।

কোভিড-১৯ এর সাথে মিউকরমাইকোসিসের সম্পর্ক ঠিক কি?

বৈজ্ঞানিকদের মতে মিউকরমাইকোসিস আর কোভিড-১৯ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা রোগ। করোনা রোগীকে বেশী পরিমানে স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ যেমন গ্লুকোকর্টিকয়েড প্রয়োগ তাদের করলে ইমিউনিটি কমে যায়। ফলে, ফাঙ্গাস ও ব্যাকটেরিয়ার  ‘সেকেন্ডারি ইনফেকশান’ হতে পারে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, মিউকরের স্পোর রক্তসংবহন পথে ঢুকলে, নিউট্রোফিল জাতীয় শ্বেতরক্তকনিকা তাকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু,  ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়লে, কম পরিমানে শ্বেতরক্তকনিকা তৈরি হয়। ফলে ব্ল্যাক-ফাঙ্গাস তার সংক্রমণ তীব্র থেকে তীব্রতর করতে থাকে। রক্তবাহ ও রক্তজালিকায় এই ছত্রাকতার ‘মাইসেলিয়াম’ এর বিস্তার ঘটিয়ে তাদের নষ্ট করে দেয় ও ভয়াবহ অসুস্থতার সৃষ্টি করে। যারা কোভিড-১৯ আক্রান্ত, সেরে উঠেছেন বা উপসর্গহীন কোভিড-১৯ পজিটিভ তাদের ক্ষেত্রে মিউকর মাইকোসিসের প্রবল সংক্রমণ প্রায়শই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।   

 Explore & Subscribe YouTube Channel

আইভারমেক্টিন এবং কোভিড-১৯
কোভিড ১৯ টিকাকরনের এর কার্যকারিতা এবং সুবিধা -ড: বিশ্বরূপ ঘোষ
শিশু এবং কোভিড-১৯ সংক্রমনের সচেতনতা -ডাঃ দীপ্তাংশু দাস
টিকাকরণ, করোনার সতর্কতা এবং বাড়িতেই চিকিৎসা – ডা: ইন্দ্রনীল সাহা
স্পাইনাল কর্ড এর সাধারণ সমস্যা গুলো মূলত কি কি? – ডা: সায়ন মান্না

তথ্যসূত্রঃ

  1. Garg D, Muthu V, Sehgal IS, et al. Coronavirus Disease (Covid-19) Associated Mucormycosis (CAM): Case Report and Systematic Review of Literature. Mycopathologia. 2021;186(2):289-298. doi:10.1007/s11046-021-00528-2
  2. Sharma S, Grover M, Bhargava S, Samdani S, Kataria T. Post coronavirus disease mucormycosis: a deadly addition to the pandemic spectrum [published online ahead of print, 2021 Apr 8]. J Laryngol Otol. 2021;1-6. doi:10.1017/S0022215121000992
  3. Reid G, Lynch JP 3rd, Fishbein MC, Clark NM. Mucormycosis. Semin Respir Crit Care Med. 2020 Feb;41(1):99-114. doi: 10.1055/s-0039-3401992. Epub 2020 Jan 30. PMID: 32000287.
  4. Ibrahim AS, Spellberg B, Walsh TJ, Kontoyiannis DP. Pathogenesis of mucormycosis. Clin Infect Dis. 2012;54 Suppl 1(Suppl 1):S16-S22. doi:10.1093/cid/cir865
  5. Camara-Lemarroy CR, González-Moreno EI, Rodríguez-Gutiérrez R, et al. Clinical features and outcome of mucormycosis. InterdiscipPerspect Infect Dis. 2014;2014:562610. doi:10.1155/2014/562610
  6. Sen M, Lahane S, Lahane TP, Parekh R, Honavar SG. Mucor in a Viral Land: A Tale of Two Pathogens. Indian J Ophthalmol. 2021 Feb;69(2):244-252. doi: 10.4103/ijo.IJO_3774_20. PMID: 33463566; PMCID: PMC7933891.
  7. Riley TT, Muzny CA, Swiatlo E, Legendre DP. Breaking the Mold: A Review of Mucormycosis and Current Pharmacological Treatment Options. Ann Pharmacother. 2016 Sep;50(9):747-57. doi: 10.1177/1060028016655425. Epub 2016 Jun 15. PMID: 27307416.

Write your comments

%d bloggers like this: