২০২০ সালে নোবেলজয়ী তিন বিজ্ঞানীর গবেষণা ভাইরাল হেপাটাইটিস সি রোগটিকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নির্মূল করে দিতে সক্ষম হবে

Reading Time: 4 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, ৩০ অক্টোবর , ২০২০

এই বছর চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করলেন তিন বিশিষ্ট বৈজ্ঞানিক; আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ এর ইনফেকসিয়াস ডিসিস বিভাগের প্রধান ডঃ হার্ভে জেমস অল্টার, ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক এবং ইউনিভার্সিটি অফ আলবের্তার গবেষক ডঃ মাইকেল হাউটন ও নিউয়র্কের রকফেলার ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডঃ চার্লস ময়েন রাইস। হেপাটাইটিস সি (Hepatitis-C) ভাইরাস আবিষ্কার ও চিকিৎসার উপর মূল্যবান গবেষণার জন্যে এঁরা এই পুরষ্কার লাভ করলেন। নোবেল কমিটি ঘোষণা করেছেন, রক্তবাহিত এই ভাইরাস সংক্রমণকে শনাক্ত করতে এই বিজ্ঞানীত্রয় বার করেছেন আধুনিক পরীক্ষা পদ্ধতি, যার ফলে সময়মতো রোগসংক্রমণ প্রতিহত করে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। এছাড়া, এই বিজ্ঞানীদের সারাজীবনের গবেষণা অদূর ভবিষ্যতে ভাইরাল হেপাটাইটিস সি রোগটিকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে নির্মূল করে দিতে সক্ষম হবে। 

কি এই ভাইরাল হেপাটাইটিস-সি?

আমাদের শরীরে, প্রধানত যকৃৎ হেপাটাইটিস সি ভাইরাস (HCV) দ্বারা আক্রান্ত হয়। একে লিভার হেপাটাইটিস বলে। HCV রক্ত ও দেহরসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে যকৃৎ কোষে সংবাহিত হয়। কোষের ভিতরে ভাইরাস নিজের সংখ্যাবৃদ্ধি করতে থাকে এবং যকৃৎ কোষকলার প্রভূত ক্ষতি করে। এর ফলে যকৃতের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় কাজগুলি ব্যাহত হয়। যকৃৎ আমাদের শরীরের প্রধান বিপাককেন্দ্র (Site of Metabolism)। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় জৈব-রাসায়নিক বিপাকক্রিয়া এখানে সংঘটিত হয়। ফলে যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে বিভিন্ন রোগলক্ষন প্রকাশ পায়। কোন কোন ক্ষেত্রে, হেপাটাইটিস সি ভাইরাস দীর্ঘকালের জন্যে যকৃতে বাসা বাঁধে। তখন দেখা দেয় লিভার সিরোসিসের মতো ভয়াবহ রোগ। গবেষণায় দেখা গেছে সারা পৃথিবীতে প্রায় ৭ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশী মানুষ প্রতিবছর হেপাটাইটিস সি রোগে আক্রান্ত হন। শুধু তাই নয়, লিভার সিরোসিস যুক্ত বেশ কিছু মানুষের মধ্যে লিভারে অতিরিক্ত প্রদাহের কারণে দেখা দেয় হেপাটিক কারসিনোমা বা লিভার ক্যান্সার।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমণের কারণ:

১. ব্লাড ট্রান্সফিউশন বা রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে।

২. হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত ব্যক্তির ব্লেড, দাড়ি কামানোর ক্ষুর, ইনজেকশন সিরিঞ্জ ব্যবহারের ফলে।

৩. হেপাটাইটিস সি আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে যৌনক্রিয়ার মাধ্যমে।

৪. গর্ভবতী মায়ের হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমণ হলে গর্ভস্থ সন্তান আক্রান্ত হতে পারে।

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ ,
এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে।নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর এন্ট্রেপ্রেনিউরশিপ প্রোগ্রাম এ কোনো পুঁজি না লাগিয়ে অংশ গ্রহণ করতে অথবা জানতে হোয়াট’স আপ করুন +19175663401

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস গবেষণা:

আজ বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্যে এই মারণ রোগটিকে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে উপরে উল্লেখিত তিন বৈজ্ঞানিকের অসামান্য অবদানের জন্যে। ডঃ হার্ভে জেমস অল্টার তাঁর গবেষক জীবনে এরকম বহু রোগীকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যাদের হেপাটাইটিস উপসর্গ থাকলেও প্যাথোলজি পরীক্ষায় তাদের হেপাটাইটিস টাইপ “এ” বা “বি” কোন শ্রেণীতেই ফেলা যায় না। বহু গবেষণায় ডঃ অল্টার আবিষ্কার করেন সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভাইরাসের অস্তিত্ব। পরবর্তী কালে যেটি পরিচিতি লাভ করে “হেপাটাইটিস সি ভাইরাস” নামে। আশির দশকে এই ভাইরাসকে পরীক্ষমূলক ভাবে শনাক্ত করে এর নামকরণ করেন ডঃ মাইকেল হাউটন। এছাড়া সেই সময়ে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা মিলে এই ভাইরাসকে রোগীর দেহে শনাক্ত করার উপযুক্ত এবং শক্তিশালী পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যে পরীক্ষায় শুধু রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস অ্যান্টিজেনকে পলিমারেজ চেন রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। 

ডঃ হাউটন দেখেছিলেন অর্থনৈতিক ভাবে অনুন্নত দেশগুলিতে প্রাথমিক পর্যায়ে হেপাটাইটিস সি পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা ও সুযোগ ছিল না, ফলে বহু মানুষ নিজেদের অজান্তেই এই রোগে আক্রান্ত হতেন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব ছিল না। ডঃ হাউটন বিশ্বের মধ্যে প্রথম বিজ্ঞানী যিনি হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের জিনোমিক সিকোয়েন্স বার করেন। পরবর্তী সময়ে সেই সিকোয়েন্স এর সাহায্যে হেপাটাইটিস সি ভ্যাকসিন তৈরীর কাজ শুরু হয়। ডঃ হাউটন বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ আলবের্তার বিশিষ্ট “লি কা শিঙ প্রফেসর অফ ভাইরোলজি” সাম্মানিক পদে আসীন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ২০০০ সালে ডঃ অল্টার এবং ডঃ হাউটন দুজনে যৌথভাবে মেডিক্যাল ক্লিনিক্যাল রিসার্চে অসামান্য অবদানের জন্যে বিশিষ্ট “ল্যাস্কার অ্যাওয়ার্ড” লাভ করেন।

হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের জেনেটিক সিকোয়েন্স আবিষ্কারের পর সেই কাজকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান ডঃ চার্লস ময়েন রাইস। রকফেলার ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর স্টাডি অফ হেপাটাইটিস সি বিভাগের প্রাক্তন অধিকর্তা ডঃ রাইস প্রথম হেপাটাইটিস সি ভাইরাস গবেষণার ইন-ভিভো অ্যানিম্যাল মডেল তৈরী করেন। মেরুদন্ডী প্রাণীর দেহে কিভাবে এই ভাইরাস রোগসংক্রমণ ছড়ায় এবং ভ্যাকসিন বা ড্রাগ পরীক্ষার সম্ভাব্য উপায় কি তা জানার জন্যে ডঃ রাইস শিম্পাঞ্জি মডেলে কাজ করতে শুরু করেন। তাঁর দেখানো পথে ভবিষ্যতের হেপাটাইটিস সি গবেষণা নিঃসন্দেহে অনেক সমৃদ্ধ হবে।

আজ হেপাটাইটিস সি সঠিক সময়ে শনাক্ত হলে তাকে সম্পূর্ণ সারানো সম্ভব। অনেক আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ বর্তমানে ব্যবহৃত হয়। মজার কথা, আমরা জানি “রেমডিসিভির” বলে একটি অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ কোভিড-১৯ চিকিৎসায় বহুল ব্যবহৃত হয়, আসলে এই ড্রাগটি প্রথমে হেপাটাইটিস সি সারানোর জন্যে আবিষ্কৃত হয়েছিলো কিন্তু সেই সময়ে এটি আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (FDA) অনুমোদন পায় নি! আজ সারা পৃথিবীতে হেপাটাইটিস সি রোগে মৃত্যুর হার নিম্নমুখী, অতি অল্প সময়ে রোগ শনাক্ত করে সুলভে চিকিৎসা করা সম্ভব হচ্ছে, দ্রুতবেগে চলছে ভ্যাকসিন তৈরীর কাজ- সেই সব সম্ভব হয়েছে এই তিন বিজ্ঞানীর মূল্যবান গবেষণার উপর ভিত্তি করে। 

https://youtube.com/channel/UCkVXzA6E_SvkvaSUdbd73hg

আপনার স্বাস্থ্য সচেতনতা আপনাকে বিপদের সময় পথ দেখাবে – বিশ্বরূপ ঘোষ, গবেষক বিজ্ঞানী । কেন ইউ টিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করবেন ? আপনার ইচ্ছে !!

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন neucradhealth@gmail.com

তথ্যসূত্রঃ

  1. Cox, A.L., El-Sayed, M.H., Kao, J. et al. Progress towards elimination goals for viral hepatitis. Nat Rev Gastroenterol Hepatol 17, 533–542 (2020). https://doi.org/10.1038/s41575-020-0332-6
  2. Burki T. Nobel Prize for hepatitis C virus discoverers. Lancet. 2020 Oct 10;396(10257):1058. doi: 10.1016/S0140-6736(20)32111-5. PMID: 33038954.
  3. Alter HJ, Liang TJ. Hepatitis C: the end of the beginning and possibly the beginning of the end. Ann Intern Med. 2012;156(4):317-318. doi:10.7326/0003-4819-156-4-201202210-00014
  4. Alter HJ, Farci P, Bukh J, Purcell RH. Reflections on the History of HCV: A Posthumous Examination. Clin Liver Dis (Hoboken). 2020;15(Suppl 1):S64-S71. Published 2020 Mar 2. doi:10.1002/cld.882
  5. Liang TJ. Hepatitis C Virus: From Obscurity to the Lasker. Gastroenterology. 2016;151(6):1052-1053. doi:10.1053/j.gastro.2016.10.011
  6. Houghton M. Discovery of the hepatitis C virus. Liver Int. 2009 Jan;29 Suppl 1:82-8. doi: 10.1111/j.1478-3231.2008.01925.x. PMID: 19207970.
  7. Houghton M. Prospects for prophylactic and therapeutic vaccines against the hepatitis C viruses. Immunol Rev. 2011 Jan;239(1):99-108. doi: 10.1111/j.1600-065X.2010.00977.x. PMID: 21198667.
  8. Moradpour D, Penin F, Rice CM. Replication of hepatitis C virus. Nat Rev Microbiol. 2007 Jun;5(6):453-63. doi: 10.1038/nrmicro1645. Epub 2007 May 8. PMID: 17487147.
  9. Billerbeck E, Wolfisberg R, Fahnøe U, Xiao JW, Quirk C, Luna JM, Cullen JM, Hartlage AS, Chiriboga L, Ghoshal K, Lipkin WI, Bukh J, Scheel TKH, Kapoor A, Rice CM. Mouse models of acute and chronic hepacivirus infection. Science. 2017 Jul 14;357(6347):204-208. doi: 10.1126/science.aal1962. PMID: 28706073; PMCID: PMC5654634.

Write your comments

%d bloggers like this: