রিল্যাপ্সিং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস চিকিৎসায় আসতে চলেছে ‘ওফ্যাটুমুম্যাব’: নতুন টার্গেটেড বি-সেল থেরাপি

Reading Time: 5 minutes

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ বাংলার প্রতিবেদন, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২০

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এমন একটি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ, যাকে সম্পূর্ণ ভাবে সারিয়ে তোলা যায় না। এমনকি, এই আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের যুগেও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের খুব বেশী ওষুধ বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই।  ঠিক এই সময়ে সুইস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি নোভার্টিস ইন্টারন্যাশনাল এজি মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস চিকিৎসায় নিয়ে আসতে চলেছে এক নতুন বি-সেল থেরাপি। তাদের উদ্ভাবিত থেরাপির নাম “কেসিম্পটা (ওফ্যাটুমুম্যাব)। নোভার্টিস ইতিমধ্যেই ইউ এস ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) থেকে কেসিম্পটা চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়েছে। এই আবিষ্কারের বিষয়ে বিস্তারিত বলার আগে আমাদের মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এবং তার বি-সেল থেরাপির প্রসঙ্গে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস:

এই রোগ স্পাইনাল কর্ড, ব্রেন স্টেম, অপটিক নার্ভ, পেরিভেন্ট্রিকুলার স্থানে এক প্রকার দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের (Chronic Inflammation) ফলে সৃষ্টি হয়। এই সব গুরুত্বপূর্ণ স্থানের স্নায়ু কোষের অ্যাক্সন গুলিকে ঘিরে থাকা মায়েলিন আবরণী শরীরে তৈরী হওয়া অটোইমিউনিটির প্রভাবে ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে ক্রমবর্ধমান বিভিন্ন স্নায়বিক অসুস্থতা দেখা দেয়। রোগীর স্বাভাবিক হাঁটা-চলা, কথা বলা ইত্যাদি কাজ ব্যাহত হয়। রোগীর ক্রমশ পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যান এবং ঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের কারণ:

এটি একটি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ। আমাদের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি বাইরে থেকে আসা জীবাণু এমনকি শরীরে তৈরী হওয়া ক্যান্সার কোষের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু কোন কোন ক্ষেত্রে, শরীরের ইমিউন কোষগুলি (যেমন- টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইট, ম্যাক্রোফেজ ইত্যাদি) এবং অ্যান্টিবডি (যাকে অটোঅ্যান্টিবডি বলে) সেই শরীরেই অবস্থিত বিভিন্ন অঙ্গের কোষগুলিকে ধ্বংস করে প্রবল অসুস্থতার সৃষ্টি করে। এই বিশেষ পরিস্থিতিকে “অটোইমিউন ডিসর্ডার” বলে। মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস এমনই একটি অটোইমিউন রোগ। এই রোগের মোট চারটি প্রকারভেদ আছে,

১. রিল্যাপসিং-রেমিটিং (Relapsing-Remitting MS):

এই প্রকার মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস সবচেয়ে বেশী ঘটে থাকে। রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার পর কিছুদিনের জন্যে রোগ উপসর্গগুলি হারিয়ে যায়। কিন্তু তারপরেই পুনরায় উপসর্গগুলি ফিরে আসে ও রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ে।

২. প্রাইমারি প্রোগ্রেসিভ (Primary Progressive MS):

এই প্রকারভেদে রোগ উপসর্গ স্থায়ী ও কম ক্ষতিকারক হয়।

৩. সেকেন্ডারি প্রোগ্রেসিভ (Seconds Progressive MS): 

রোগ উপসর্গ যথেষ্ট মারাত্মক ও স্থায়ী হয়।

৪. প্রোগ্রেসিভ-রিল্যাপসিং (Progressive-Relapsing MS): 

এই প্রকারভেদে রোগের উপসর্গগুলি বারে বারে ফিরে আসে এবং রোগের প্রকোপও খুব বেশী হয়। তবে এই পরিস্থিতি খুব কম সংখ্যক রোগীর মধ্যে দেখা যায়।

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে।

ঠিক কি কারণে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হয় তা এখনো সম্পূর্ণ ভাবে জানা যায় নি। বিজ্ঞানীদের মতে জেনেটিক কারণে, ভিটামিন-ডি এর অভাবে, এমনকি জীবাণু সক্রমণের কারণেও এই রোগ হতে পারে। এই রোগে মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকান্ডের স্নায়ুকোষগুলি ক্রমাগত বি-লিম্ফোসাইট নিঃসৃত অ্যান্টিবডি, টি-লিম্ফোসাইট  এবং মাক্রোফাজ দ্বারা আক্রান্ত হয়। এই পরিস্থিতিতে স্নায়ুকোষের মায়েলিন আবরণী ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। ফলে স্নায়ুগুলির মধ্যে যোগাযোগ ও কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হবার জন্যে কি প্রকার আণবিক কৌশল (Molecular Mechanism) দায়ী তা নিয়েও অনেক মতবাদ আছে। তাদের মধ্যে বর্তমানে যেটি সবচেয়ে বেশী গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে তা হলো বি-লিম্ফোসাইটের অনিয়ন্ত্রিত কার্যকারিতার ফল হলো এই রোগ। মানবদেহে প্রধানত দুই প্রকার বি-লিম্ফোসাইট (বি-লিম্ফোসাইটের দুই সাব-সেট) পাওয়া যায়। তারা হলো B1B এবং B2B। গবেষণায় দেখা গেছে B1B কোষগুলি বিশেষ ভাবে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হবার জন্যে দায়ী। মজার ব্যাপার হলো, শরীরে আরো এক প্রকার -বি-লিম্ফোসাইটের সন্ধান পাওয়া যায় যারা বি-লিম্ফোসাইটের কাজকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে বা বলা যায় বি-লিম্ফোসাইটের সক্রিয়তা কমিয়ে আনে। এদের রেগুলেটরি বি-লিম্ফোসাইট (B-reg) বলে। বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে রক্তে প্রো-ইনফ্লামেটরি সাইটোকাইনগুলির মাত্রা ভীষণ ভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে IL-10, IL-35, TGF-বিটা যাদের “প্রো-ইনফ্লামেটরি মিডিয়েটর” বলে তারা রেগুলেটরি বি-লিম্ফোসাইটের কাজ অনিয়ন্ত্রিত করতে থাকে, ফলে B1B লিম্ফোসাইটগুলি অতি সক্রিয় হয়ে পড়ে। রোগের এই পর্যায়ে B1B লিম্ফোসাইটগুলি থেকে দ্রুত প্লাসমাকোষ তৈরী হতে থাকে এবং তার থেকে প্রচুর পরিমানে ইমিউনোগ্লোবিউলিন (IgG-Antibody) তৈরী হয়ে রক্তে ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডে (CSF) ছড়িয়ে পড়ে। একই সাথে B1B লিম্ফোসাইটগুলি ম্যাক্রোফেজকে উত্তেজিত করে আর Th1 এবং Th17 টি-লিম্ফোসাইট রেস্পন্স বাড়িয়ে দেয়। সামগ্রিক ভাবে এই সমস্ত ইমিউন কোষ ও অটো অ্যান্টিবডিগুলি নিউরোনের প্রভূত ক্ষতিসাধন করে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস সৃষ্টি করে। 

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস রোগ নির্ণয় ও তার চিকিৎসা:

সাধারণ ভাবে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে প্রো-ইনফ্লামেটরি সাইটোকাইনের পরিমান ও রক্তে ইমিউনোগ্লোবিউলিনের পরিমান মেপে দেখা হয়। এগুলির অস্বাভাবিক মাত্রা অনেক ক্ষেত্রেই মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নির্দেশ করে। এছাড়া “লাম্বার পাংকচার” পদ্ধতিতে সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড সংগ্রহ করে তাতে IgG-ইমিউনোগ্লোবিউলিনের উপস্থিতি ও মাত্রা দেখা হয়। চিকিৎসকরা মস্তিষ্কের নানা স্থানের MRI স্ক্যান করে “মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস প্লাক” এর উপস্থিতি নির্ণয় করতে পারেন। বিভিন্ন স্নায়ুকোষের বৈদ্যুতিক সংকেত (Electrical Signal) “ইভোক পোটেনসিয়াল টেস্ট” করে পরিমাপ করা হয়। এই সংকেতগুলির বিশ্লেষণ করেও মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নির্ণয় করা যায়।

মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের প্রকারভেদ অনুযায়ী, চিকিৎসাপদ্ধতি স্থির করা হয়। সাধারণত, অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি ড্রাগ এবং স্টেরোয়েড দেওয়া হয়। স্টেরোয়েডে কাজ না হলে, নতুন প্লাসমা ebong ইমিউনোগ্লবিউলিনের মিশ্রণকে রোগীর শরীরে প্রবেশ করিয়ে প্লাসমা এক্সচেঞ্জ বা “প্লাসমাফেরেসিস” করা হয়। তবে, রিল্যাপসিং-রেমিটিং প্রকার মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমোদন প্রাপ্ত “ডিসিস মডিফায়িং থেরাপি (DMT)” ব্যবহার করা হয়। এই থেরাপিতে ইন্টারফেরন বিটা ও অন্যান্য অনুমতিপ্রাপ্ত ড্রাগ ব্যবহার করে রোগীর চিকিৎসা করা হয়। তবে এখনো পর্যন্ত এই রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি ও নির্দিষ্ট ড্রাগের সংখ্যা বেশ সীমিত।

FDA অনুমদিত নোভার্টিসের নতুন ড্রাগ কেসিম্পটা মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে এই ড্রাগ সাব কিউটেনিয়াস ইঞ্জেক্টবল পেন হিসাবে পাওয়া যাবে। নোভার্টিসের বৈজ্ঞানিকরা ক্যালিফোর্নিয়ার UCSF উইল ইনস্টিটিউট ফর নিউরোসায়েন্সের ডঃ স্টিফেন এল হাউসার ও ইউনিভার্সিটি হসপিটাল বাসেলের ডঃ ক্যাপপোসের সাথে যৌথ উদ্যোগে কেসিম্পটা বা অফ্যাটুমুম্যাব থেরাপির ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলির তৃতীয় পর্যায় সম্পন্ন করে। তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালগুলির নাম রাখা হয় অ্যাসক্লিপিওস-I এবং II। এই ট্রায়ালে রিল্যাপসিং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের রোগীদের এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নেওয়া হয়। ট্রায়ালে দুটি ড্রাগের তুলণামূলক পরীক্ষা করা হয়। রোগীদের মধ্যে ৯৪৬ জনকে অফ্যাটুমুম্যাব ইঞ্জেকশন (২০ মিলিগ্রাম) এবং ৯৩৬ জনকে টেরিফ্লুনোমাইড ওরাল ট্যাবলেট (১৪ মিলিগ্রাম) দেওয়া হয়। এরপর নিয়মিত সময়ে MRI স্ক্যান করে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, অফ্যাটুমুম্যাবের প্রয়োগে এক বছরের মধ্যেই রিল্যাপসিং মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের হার অনেক কমে গেছে। এই ক্ষেত্রে টেরিফ্লুনোমাইড উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতা দেখাতে পারে নি।

কি এই ওফ্যাটুমুম্যাব?

অফ্যাটুমুম্যাব বা কেসিম্পটা হলো অ্যান্টি CD-20 অ্যান্টিবডি। সক্রিয় বি-লিম্ফোসাইটের কোষপর্দায় প্রকাশ পায় CD-20 প্রোটিন। এই প্রোটিন বি-লিম্ফোসাইটের বিভিন্ন কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বি-লিম্ফোসাইটের দ্রুত কোষবিভাজন করানো  এবং টি-লিম্ফোসাইটকে সক্রিয় করে তোলা। এই দুটি কাজই স্নায়ুকোষের মায়েলিন আবরণীর ক্ষতি করে। অ্যান্টি CD-20 অ্যান্টিবডি প্ৰয়োগ করলে CD-20 প্রোটিনের আণবিক সংকেতপথগুলি (Molecular Signaling Pathway) বন্ধ হয়ে যায়। দেখা গেছে এর ফলে Th1 ও Th17 টি-লিম্ফোসাইটের সক্রিয়তা কমে যায় ও স্নায়ুকোষ কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

নোভার্টিস নিউরোসায়েন্স গ্লোবাল প্রোগ্রাম প্রধান কৃষন রামানাথান জানিয়েছেন নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার দিক থেকে অন্যান্য ড্রাগের থেকে অনেক এগিয়ে আছে অফ্যাটুমুম্যাব। সমস্ত রোগীর মাত্র ১০% অফ্যাটুমুম্যাবের অতি সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তিনি জানান অদূর ভবিষ্যতে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের রোগীরা বাড়িতে বসেই অফ্যাটুমুম্যাব বি-সেল থেরাপি নিতে পারবেন।

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন neucradhealth@gmail.com

তথ্য সুত্রঃ

  1. https://www.novartis.com/search-results?query=ofatumumab
  2. Hauser SL, Bar-Or A, Cohen JA, et al. Ofatumumab versus Teriflunomide in Multiple Sclerosis. N Engl J Med. 2020;383(6):546-557. doi:10.1056/NEJMoa1917246
  3. Miller AE, Wolinsky JS, Kappos L, et al. Oral teriflunomide for patients with a first clinical episode suggestive of multiple sclerosis (TOPIC): a randomised, double-blind, placebo-controlled, phase 3 trial. Lancet Neurol. 2014;13(10):977-986. doi:10.1016/S1474-4422(14)70191-7
  4. Kish T. Promising Multiple Sclerosis Agents In Late-Stage Development. P T. 2018;43(12):750-772.
  5. Greenfield AL, Hauser SL. B-cell Therapy for Multiple Sclerosis: Entering an era. Ann Neurol. 2018;83(1):13-26. doi:10.1002/ana.25119
  6. Milo R. Therapies for multiple sclerosis targeting B cells. Croat Med J. 2019;60(2):87-98. doi:10.3325/cmj.2019.60.87
  7. https://www.nature.com/articles/d42859-018-00030-8
  8. Arneth BM. Impact of B cells to the pathophysiology of multiple sclerosis. J Neuroinflammation. 2019;16(1):128. Published 2019 Jun 25. doi:10.1186/s12974-019-1517-1
  9. Racke MK. The role of B cells in multiple sclerosis: rationale for B-cell-targeted therapies. Curr Opin Neurol. 2008;21 Suppl 1:S9-S18. doi:10.1097/01.wco.0000313359.61176.15

Write your comments

You may have missed

%d bloggers like this: