মেনিনজাইটিসের প্রকারভেদ ও চিকিৎসা পদ্ধতিঃ একটি আলোচনা

Reading Time: 3 minutes

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী, পি.এইচ.ডি; নিউক্র্যাড হেলথ ডেস্ক, ৩১ আগস্ট, ২০২১

মেনিনজাইটিস হোল প্রদাহজনিত এক রোগ যা প্রধানত মস্তিষ্ক ও সুষুম্নাকাণ্ডের আবরণীতে হয়ে থাকে। এই রোগ অণুজীব ঘটিত সংক্রমণের জন্যে দেখা দেয়। প্রধানত, মেনিনজাইটিস

রোগে শিশু, কিশোর ও অল্পবয়স্ক মানুষ বেশী আক্রান্ত হয়। ঠিক সময়ে দ্রুত চিকিৎসা শুরু না হলে এই রোগে রক্তে বিষক্রিয়া (সেপটিসেমিয়া) দেখা দেয়, সাথে মস্তিষ্ক ও বিভিন্ন স্নায়ু ভীষণ ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।  

মেনিনজাইটিসের উপসর্গঃ 

এই রোগের সাধারন উপসর্গগুলি কয়েকদিন বা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রকাশ পেতে পারে। যেমন-

  • জ্বর
  • মাথার যন্ত্রণা
  • গলায় ও ঘাড়ে আড়ষ্ট ভাব
  • মুখের পেশী অবশ ভাব
  • চলাফেরায় অসুবিধা
  • আলোয় অস্বস্তি অনুভব করা
  • পেট ব্যাথা
  • বমি
  • ক্ষুধামান্দ্য ও পিপাসা অনুভব না করা
  • মনোযোগের অভাব
  • ঘুম ভাব
  • শরীরে কাঁপুনি
  • চামড়ায় র‍্যাশ বার হওয়া  

মেনিনজাইটিসের কারনঃ

এই রোগ প্রধানত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এমনকি ছত্রাকের সংক্রমণের ফলেও হয়ে থাকে। রোগীর শরীরের সাইনাস, গলা ও কান মেনিনজাইটিসের প্রধান সংক্রমণস্থান। গবেষণায় দেখা যায় কিছু অন্যান্য রোগে যেমন, অটোইমিউন রোগ, বিশেষ কিছু ক্যান্সার ড্রাগ ব্যাবহারে, টিউবারকিউলোসিস, সিফিলিস ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হবার পরে মেনিনজাইটিসের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এছাড়াও, প্লীহা কোন কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হলে বা দীর্ঘদিন ধরে কম অনাক্রম্যতা জনিত কোন রোগে ভুগলে মেনিনজাইটিস হতে পারে। ভিড় ও অত্যাধিক জনবহুল পরিবেশে বাস করলে এই রোগ হবার সম্ভাবনা থাকে। 

মেনিনজাইটিসের প্রকারভেদঃ 

  • ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস- এই ধরনের মেনিনজাইটিস যথেষ্ট গুরুতর ও প্রানঘাতী হয়ে উঠতে পারে। কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে যেমন- স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি, হিমোফিলাস ইনফ্লুএঞ্জি, লিস্টেরিয়া মনোসাইটোজেনেস, নিসেরিয়া মেনিনজাইটিডিস এই রোগ হয়। এই সব প্যাথোজেনিক ব্যাকটেরিয়া রক্তসংবহন পথে ঢুকে সাইনাস, নাক, কান, গলা ইত্যাদির মাধ্যমে মস্তিষ্কে গিয়ে পৌঁছয়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলি অসুস্থ ব্যাক্তির হাঁচি-কাশির সাথে সুস্থ ব্যাক্তিকে আক্রান্ত করে।    
  • ভাইরাল মেনিনজাইটিস- এই ভাইরাস ঘটিত মেনিনজাইটিস কিছুটা কম প্রাণঘাতী। অন্য রোগীর শরীরে ডায়ারিয়া করে এমন এন্টেরো-ভাইরাস এই ধরনের মেনিনজাইটিস করে থাকে।  
  • ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস- এই ধরনের রোগের প্রকোপ কিছুটা কম। অনাক্রম্যতা কম (যেমন- এইডস আক্রান্ত মানুষ) এমন রোগীর শরীরে ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস হয়ে থাকে। চিকি
  • প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস- এই ধরনের মেনিনজাইটিস বেশ বিরল এবং ছোঁয়াচেও নয়। কিছু প্রজাতির শামুক, মাছ ও পোলট্রির মুরগি থেকে প্যারাসাইটিক মেনিনজাইটিস হতে পারে। এই সব প্রাণীর দেহে বসবাসকারী পরজীবী প্রাণীর ডিম থেকে মানুষের শরীরে এই ধরনের মেনিনজাইটিস হয়। 

মেনিনজাইটিস রোগ নির্ধারণঃ 

চিকিৎসক রোগীর পরিবারের রোগের ইতিহাস, বাসস্থান, ইত্যাদি সম্পর্কে জেনে নিয়ে রোগীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। রোগীর ঘাড়ের আড়ষ্ট ভাব, চামড়ায় র‍্যাশ, ইত্যাদি থাকলে রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং করে মেনিনজাইটিস ধরা হয়। এছাড়াও, স্পাইনাল কর্ড থেকে তরল নমুনা সংগ্রহ করে (একে ‘স্পাইনাল ট্যাপ’ বলে) প্যাথোলজিক্যাল পরীক্ষা করলে মেনিনজাইটিস ধরা পড়ে। 

মেনিনজাইটিসের চিকিৎসাঃ 

  • ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস হলে চিকিৎসক ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহারের পরামর্শ দেন, অবশ্য নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হলে বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহার করা যায়। তার সাথে প্রদাহ কমানোর ড্রাগ দিয়ে রোগীকে সুস্থ করে তোলা হয়।
  • ভাইরাস সংক্রমণ জনিত মেনিনজাইটিসের জন্যে অ্যান্টি-ভাইরাল ড্রাগ সহজে ব্যাবহার করা হয় না। হারপেস ও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতোই পরিমিত বিশ্রাম ও প্রচুর জল পান করলে এই রোগ ঠিক হয়ে যায়। তবে প্রয়োজনে প্যারাসিটামল ব্যাবহার করা যেতে পারে। 
  • ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস হলে নির্দিষ্ট অ্যান্টি-ফাঙ্গাল ড্রাগ ব্যাবহারে এই রোগ ভালো হয়ে যায়।  

মেনিনজাইটিস নিয়ন্ত্রণঃ

  • ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত রোগীর থেকে দুরত্ব বজায় রাখতে হবে। 
  • জনবহুল স্থানে ফেসিয়াল মাস্ক ব্যাবহার করতে হবে।
  • নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, আইসো-প্রোপাইল অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যাবহার করতে হবে। 
  • কখনোই অপরের টুথব্রাশ, খাবারের বাসন ব্যাবহার করা উচিত নয়। 
  • খাবার ভালো ভাবে সিদ্ধ করে খাওয়া উচিত। কাঁচা স্যালাড ও শাক-সবজি ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে।
  • কখনো কখনো নিউমোনিয়া ও ফ্লু হলেও মেনিনজাইটিস হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ঠিক সময়ে ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।  

তথ্যসূত্রঃ

  1. Hoffman O, Weber RJ. Pathophysiology and treatment of bacterial meningitis. Ther Adv Neurol Disord. 2009;2(6):1-7. doi:10.1177/1756285609337975
  2. Meningitis. Paediatr Child Health. 2001;6(3):126-127. doi:10.1093/pch/6.3.126
  3. Griffiths MJ, McGill F, Solomon T. Management of acute meningitis. Clin Med (Lond). 2018;18(2):164-169. doi:10.7861/clinmedicine.18-2-164
  4. Bagheri-Nesami M, Babamahmoodi F, Nikkhah A. Types, Risk Factors, Clinical symptoms and Diagnostic Tests of Acute Adult Meningitis in Northern Iran During 2006-2012. J Clin Diagn Res. 2015;9(5):IC01-IC05. doi:10.7860/JCDR/2015/11991.5936
  5. Logan SA, MacMahon E. Viral meningitis. BMJ. 2008;336(7634):36-40. doi:10.1136/bmj.39409.673657.AE
  6. Brouwer MC, Tunkel AR, van de Beek D. Epidemiology, diagnosis, and antimicrobial treatment of acute bacterial meningitis. Clin Microbiol Rev. 2010;23(3):467-492. doi:10.1128/CMR.00070-09
ZyCov-D এর ভ্যাকসিন আমাদের কতটা উপযোগী হয়ে উঠতে পারে?

Write your comments

%d bloggers like this: