ভারতে আবিষ্কৃত হলো ২৩ প্রকার ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত নিউমোনিয়ার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন

Reading Time: 3 minutes

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী, নিউক্র্যাড হেলথ ডেস্ক, জুলাই ২৪,২০২০

কিছুদিন আগে ইউনাইটেড নেশানস চিলড্রেন’স ফান্ড বা UNICEF একটি সমীক্ষায় জানায়, পৃথিবীতে প্রায় ৮ লক্ষেরও বেশী শিশু নিউমোনিয়ার শিকার হয় এবং প্রতি ৩৯ সেকেন্ডে একজন শিশুর নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশী। সমীক্ষার সংখ্যাগুলি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সমীক্ষার রিপোর্টে বলা হয়েছে, যে পাঁচটি দেশে অর্ধেকেরও বেশী সংখ্যক শিশুমৃত্যু ঘটেছে, তারা হোল নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও ভারত। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে নিউমোনিয়ায় শিশুমৃত্যুর নিরিখে ভারতের স্থান দ্বিতীয়। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতে, কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে সেরাম ইন্সিটিউট অফ ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ নিউমোনিয়া ভ্যাকসিনের আবিষ্কার। ২৩ ধরনের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত নিউমোনিয়া প্রতিরোধী নিউমোকক্কাল পলিস্যাকারাইড কনজুগেট ভ্যাকসিন (PPSV23)  ইতিমধ্যেই ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ফেজ-I/II/III সাফল্যের সাথে অতিক্রম করেছে। সম্প্রতি এই ভ্যাকসিন ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার (DCGI) প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেয়েছে।   

এই ভ্যাকসিনের বিস্তারিত বিবরনের আগে আমাদের জানা দরকার, নিউমোনিয়া রোগটি কি এবং কিভাবেই বা সেটি সংক্রমিত হয়। 

প্রধানত ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাকের সংক্রমণে নিউমোনিয়া রোগ হয়। আমাদের ফুসফুসে অবস্থিত অসংখ্য বায়ুথলির প্রদাহ (Inflammation) জনিত কারনে, বায়ুথলির অভ্যন্তরস্থ ফাঁকা স্থানে জমা হতে থাকে তরল পদার্থ, পুঁজ ইত্যাদি। সাথে শুরু হয় কফযুক্ত কাশি, প্রবল জ্বর, মাথার যন্ত্রণা ও শ্বাসকষ্ট। সময়ে চিকিৎসা না করালে নিউমোনিয়া প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। বিশেষ করে, পাঁচ বছরের নিচের শিশু, প্রবীণ মানুষ, কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন রোগীর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ।

নিউমোনিয়ার শ্রেণীবিভাজন:

১. কমিউনিটি অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া: সবচেয়ে বেশী সংক্রমিত নিউমোনিয়া। কারণ-

ব্যাকটেরিয়া- স্ট্রেপটোকক্কাস নিউমোনি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। এই ধরণের নিউমোনিয়ায় ফুফুসের যেকোনো একটি খন্ডে বা লোবে চুড়ান্ত সংক্রমণ হয় বলে একে ‘লোবার নিউমোনিয়া’ বলে।

ব্যাটেরিয়া সদৃশ অণুজীব- সবচেয়ে মৃদু প্রকৃতির নিউমোনিয়া। মাইকোপ্লাসমা নিউমোনি অণুজীবের সংক্রমণে ঘটে।

ছত্রাক- যারা দীর্ঘদিন অন্য জটিল অসুখে ভুগছেন বা যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম, ছত্রাক সংক্রমণে তাদের নিউমোনিয়া হয়।

ভাইরাস- ভাইরাস সংক্রমণে মৃদু থেকে মারাত্মক ধরণের নিউমোনিয়া হতে পারে। বিশেষ করে শিশুরা ভাইরাল নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়। কোভিড-১৯ রোগের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া প্রবল আকার নেয় এবং রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে।

২. হসপিটাল অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া: নোসোকমিয়াল ইনফেকশন এর কারণে এই নিউমোনিয়া হয়। হসপিটালে ভর্তি হওয়া রোগী অ্যান্টিবডি রেসিস্টেন্ট ব্যাকটেরিয়া দিয়ে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, নেবুলাইজার, ভেন্টিলেশন ইত্যাদি যন্ত্র থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

৩. হেলথকেয়ার  অ্যাকোয়ার্ড নিউমোনিয়া: বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, OPD, কিডনি ডায়ালিসিস সেন্টার ইত্যাদি স্থানে রোগীরা নোসোকমিয়াল ইনফেকশনের মাধ্যমে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন।

৪. অ্যাসপিরেশান নিউমোনিয়া: ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত দূষিত খাদ্য, পানীয়, লালারস ইত্যাদি সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করলে এই প্রকার নিউমোনিয়া হয়। যাদের মস্তিষ্কে জটিল রোগে, আঘাতে বা অত্যাধিক অ্যালকোহল ও ড্রাগ গ্রহণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

http://www.neucrad.com

সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া ২০১৩ সালে ৩৪ জন পূর্ণবয়স্ক মানুষের মধ্যে প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করে। দ্বিতীয় ট্রায়াল তারা ১১৪ জন শিশুর উপর সম্পন্ন করে। তৃতীয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ছয় থেকে আট বছরের শিশুরা অংশগ্রহণ করে। প্রতিটি ট্রায়ালেই ভালো ফল পাওয়া যায়। DCGI এর তরফ থেকে স্পেশাল এক্সপার্ট কমিটি (SEC) ট্রায়ালের রিপোর্ট খতিয়ে দেখে ভ্যাকসিনটিকে বাজারে ছাড়ার অনুমতি দেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভ্যাকসিনটি ২,২৫০ জন শিশুর মধ্যে গাম্বিয়াতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহৃত হয় এবং তা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রয়োজনীয় অনুমোদন পায়।

স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি ব্যাকটেরিয়ার সেরোটাইপগুলির ক্যাপসুল থেকে পলিস্যাকারাইড পরিশুদ্ধ (Purify) করে তার সাথে একটি ক্যারিয়ার অনু যুক্ত করা হয়। এতে পলিস্যাকারাইড কনজুগেটেড ভ্যাকসিনটির ইমিউনিটি বৃদ্ধি করার ক্ষমতা জন্মায়। সেরাম ইনস্টিটিউটের এক্সেকিউটিভ ডিরেক্টর রাজীব ধেরে জানিয়েছেন, ভারতে ব্যবহৃত অন্যান্য নিউমোনিয়া ভ্যাকসিনের তুলনায় এই নতুন ভ্যাকসিনের দাম অনেক কম হবে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই কোম্পানি ১০০ লক্ষ ডোজ প্রতি বছর তৈরী করতে সক্ষম হবে। আপাতত, ৪০-৫০ লক্ষ ডোজ এখন শুধু ভারতের জন্যে তৈরী করা সম্ভব।

সেরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার এই নতুন নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন চালু হলে, শিশু মৃত্যুর হার অনেকটাই কমে আসবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। তার সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ যাঁরা ফুসফুসের অসুখে ভুগছেন বা ডায়াবেটিস আছেন তাদের ক্ষেত্রেও এই ভ্যাকসিন নিউমোনিয়া প্রতিহত করবে বলে আশা করা যায়।

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন neucradhealth@gmail.com

তথ্যসূত্রঃ 

  1. https://www.seruminstitute.com/news.php
  2. https://www.who.int/vaccine_safety/initiative/tools/Pneumococcal_Vaccine_rates_information_sheet.pdf?ua=1
  3. Berical AC, Harris D, Dela Cruz CS, Possick JD. Pneumococcal Vaccination Strategies. An Update and Perspective. Ann Am Thorac Soc. 2016;13(6):933-944. doi:10.1513/AnnalsATS.201511-778FR
  4. Daniels CC, Rogers PD, Shelton CM. A Review of Pneumococcal Vaccines: Current Polysaccharide Vaccine Recommendations and Future Protein Antigens. J Pediatr Pharmacol Ther. 2016;21(1):27-35. doi:10.5863/1551-6776-21.1.27
  5. Verma R, Khanna P. Pneumococcal conjugate vaccine: a newer vaccine available in India. Hum Vaccin Immunother. 2012;8(9):1317-1320. doi:10.4161/hv.20654
বিজ্ঞদাদুর পর্বগুলি দেখুন
বেলাদিদির পর্বগুলি দেখুন

Write your comments

%d bloggers like this: