ফ্যাবিফ্লুঃ কোভিড-১৯ চিকিৎসায় আসতে চলেছে ভারতের প্রথম অনুমোদিত ওর‍্যাল অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ

Reading Time: 4 minutes

নিউক্র্যাড হেলথ বাংলা জুন ২৩, ২০২০

ভারতে নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ যখন ৪ লক্ষ্ ছাড়িয়েছে, রোগী মৃত্যুর হার যেখানে প্রতিদিন ঊর্ধ্বগামী, সেই সময়ে করোনা চিকিৎসায় নবতম সংযোজন ওর‍্যাল অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ-ফ্ল্যাভিপিরেভির (Flavipiravir)। যার ব্র্যান্ড নাম রাখা হয়েছে ‘ফ্ল্যাবিফ্লু’। ভারতের খ্যাতনামা বায়োফার্মা কোম্পানি গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস অনেক গবেষণার পর এই ওষুধ বাজারে আনতে চলেছে। মুম্বই এর এই ফার্মাসিউটিক্যাল সংস্থা, ইতিমধ্যেই ভারতের ড্রাগ নিয়ন্ত্রক বিভাগ- ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল অফ ইন্ডিয়া বা DCGI এর থেকে ফ্ল্যাভিপিরেভির কে করোনাচিকিৎসায় ব্যাবহারের জন্যে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পেয়েছে। 

ফ্যাবিফ্লুঃ কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য

আমাদের শরীরে পাওয়া যায় পিউরিন এবং পাইরিমিডিন নামের হেটেরসাইক্লিক অ্যারোমেটিক যৌগ। যারা কোষের ডিএনএ (DNA) এবং আরএনএ (RNA) এর গঠনে নাইট্রোজেন বেস হিসাবে কাজ করে। মজার কথা, এই পিউরিন বেসের খুব কাছাকাছি রাসায়নিক গঠনযুক্ত যৌগ বা ‘অ্যানালগ’ হলো ফ্ল্যাভিপিরেভির। না, ফ্ল্যাভিপিরেভির কোন নতুন আবিষ্কৃত ড্রাগ নয়। ইতিমধ্যেই, বাংলাদেশ, সংযুক্ত আরব আমীরশাহিতে (UAE) এই ড্রাগের যথেষ্ট ব্যাবহার আছে। মিশর ও জর্ডনে এই ড্রাগ এখন ছাড়পত্রের অপেক্ষায়। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হোল, জাপান ২০১৪ সালেই ফ্ল্যাভিপিরেভিরকে ইনফ্লুয়েঞ্জা চিকিৎসার জন্যে অনুমোদন করেছিল। বর্তমানে, সংকটজনক করোনা পরিস্থিতিতে জাপানে এই ড্রাগ প্রথমে অনুমতি ছাড়াই ‘অত্যন্ত জরুরি পরিস্থিতিতে, বিশেষ বিধিনিষেধের সাথে’ প্রায় ২,০৫০ জন রোগীর উপর ব্যাবহার করা হয়। চিকিৎসার পরিভাষায়, ড্রাগের এই বিশেষ ব্যাবহার পদ্ধতিকে ‘কম্প্যাশানেট ইউজ’ বলে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে জাপান জানিয়েছে, যে ফ্ল্যাভিপিরেভির এর সাফল্যের হার প্রায় ৮৮ শতাংশ। 

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ এর উদ্যোগে, নভেল করোনাভাইরাসের সলিডারিটি ট্রায়াল হিসাবে, ফ্ল্যাভিপিরেভিরের উপর গবেষণা ও তার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করে গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালস। তাদের তরফে জানানো হয়েছে, ফ্ল্যাভিপিরেভির তাদের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে যথেষ্ট ভালো ফল করেছে। কোম্পানির দাবী, মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের করোনা সংক্রমনে, এই ড্রাগ ব্যাবহার করা যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অল্পবয়স্ক থেকে শুরু করে, ৮০-৯০ বছরের করোনা সংক্রমিত রোগীর অসুস্থতা কমাতেও এই ড্রাগ সাহায্য করে। এছাড়া, রোগীর কো-মরবিডিটির কারনে, করোনা সংক্রমণ যেখানে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির রূপ নেয়, সেখানে ফ্ল্যাভিপিরেভিরের ব্যাবহার বিশেষ ফলপ্রসূ। গবেষণায় প্রমানিত, এই ফ্ল্যাভিপিরেভির, করোনা রোগীর শরীরে বাড়তে থাকা ভাইরাসের পরিমান, ড্রাগ প্রয়োগের ৪ দিনের মাথায় কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। 

গ্লেনমার্ক ফার্মাসিউটিক্যালসের চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর মিস্টার গ্লেন সালদানহা ফ্ল্যাভিপিরেভিরের রিকভারি ট্রায়ালের ফলাফল নিয়ে যথেষ্ট আশাবাদী। তাঁর মতে ফ্ল্যাভিপিরেভির বা ফ্যাবিফ্লু করোনা সংক্রমণ কমাতে কার্যকরী। বর্তমান পরিস্থিতিতে, ভারতে করোনা সংক্রমণ যেভাবে বেড়ে চলেছে, তাতে কিছুটা হলেও রাশ টানবে এই ফ্যাবিফ্লু। 

http://www.neucrad.com

কি ভাবে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধ করবে ফ্যাবিফ্লু?

নভেল করনাভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশ করে প্রধানতঃ ফুসফুসের কোষগুলিকে আক্রান্ত করে। ভাইরাস কোষে প্রবেশ করে, তার জেনেটিক মেটিরিয়াল অর্থাৎ RNA অনুর প্রতিলিপিকরন (Replication) শুরু করে। এই কাজটি করার জন্যে সে কোষের থেকে ‘পিউরিন নিউক্লিওসাইড’ গ্রহন করে। আগেই আমরা আলোচনা করেছি যে ফ্যাবিফ্লু একটি ‘পিউরিন অ্যানালগ’ বা পিউরিনের সাথে গঠনগত সাদৃশ্যযুক্ত। এই ক্ষেত্রে, প্রতিলিপিকরন করার সময়  একই চেহারার ‘পিউরিন নিউক্লিওসাইড’ ও ‘পিউরিন অ্যানালগ’ এর মধ্যে প্রতিযোগীতা শুরু হয়। ‘পিউরিন নিউক্লিওসাইড’ এর বদলে ফ্যাবিফ্লু প্রতিলিপিকরনের কাজে যোগ দেবার সাথে সাথেই ভাইরাসের RdRp (RNA-dependent-RNA-Polymarese) উৎসেকের কাজ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর ফলে ভাইরাসের প্রতিলিপিকরন বন্ধ হয়ে যায়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য, ফ্যাবিফ্লু কোষের বাইরে সক্রিয় নয়। কোষের বাইরে এই নিষ্ক্রিয় অবস্থাকে ‘প্রো-ড্রাগ’ বলা হয়। কোষে প্রবেশ করার পর, এই ‘প্রো-ড্রাগ’ প্রয়োজনীয় জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ‘সক্রিয় ড্রাগে’ পরিনত হয়। সক্রিয় ফ্যাবিফ্লু ভাইরাস সংক্রমণকে প্রতিহত করে।

ফ্যাবিফ্লুর করোনাভাইরাস আক্রান্ত কোষে কাজ করার সম্ভাব্য কৌশল (Probable Mechanism): আক্রান্ত কোষের বাইরে ফ্যাবিফ্লু অ্যালডিহাইড অক্সিডেজ উৎসেচকের প্রভাবে নিষ্ক্রিয় থাকে। কোষে প্রবেশ করার পর বিভিন্ন ধাপে জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়া করে সক্রিয় ‘ফ্ল্যাভিপিরেভির-RTP’-তে পরিনত হয়। এই সক্রিয় যৌগটি  RdRp (RNA-dependent-RNA-Polymarese) উৎসেকের কাজ বাধা দেয়। ফলে, করোনাভাইরাসের প্রতিলিপিকরন বন্ধ হয়ে যায়।      

কিভাবে ব্যবহার করা যাবে এই ফ্যাবিফ্লু?

ফ্যাবিফ্লু ড্রাগটিকে করোনা চিকিৎসায় ওর‍্যাল ট্যাবলেট হিসাবে ব্যাবহার করা যাবে। ইনট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন (IV) দেবার প্রয়োজন হবে না। এর দামও সাধ্যের মধ্যে, মাত্র ১০৩ টাকা প্রতি ট্যাবলেট।  এই ড্রাগ কেবলমাত্র চিকিৎসকের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যাবহার করা যাবে। ড্রাগের প্রস্তাবিত ডোজ হোল ১৮০০ মিলিগ্রাম (একদিনে দুইবার ব্যাবহার করা যায়) এরপর ৮০০ মিলিগ্রাম করে দুই সপ্তাহ উপসর্গ বিচার করে ব্যাবহার করার নিয়ম। গ্লেনমার্ক কোম্পানি জানিয়েছে, যে তারা ‘ইউমিফেনোভির’ নামে আরও একটি অ্যান্টিভাইরাল নিয়ে ফ্যাবিফ্লুর সাথে ‘কম্বিনেশান থেরাপি’-র ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালাচ্ছে। কোভিড-১৯ রোগীদের উপর এই থেরাপি কি প্রভাব ফেলবে তা জানা এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। বিজ্ঞানীমহলের ধারনা, করোনাভাইরাসের প্রতিলিপিকরন যদি ফ্যাবিফ্লু দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে থামিয়ে দেওয়া যায়, তবে পরবর্তী পর্যায়ে ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’- যা  করোনা সংক্রমণের একটি ভয়াবহ ধাপ, তাকে এড়ানো সম্ভব হবে। তাই, বিজ্ঞানীদের সাথে সাধারন মানুষ তাকিয়ে আছেন এই ফ্যাবিফ্লুর ভবিষ্যৎ কার্যকারীতার দিকে। 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://www.glenmarkpharma.com/sites/default/files/Glenmark-FabiFlu-Press-Brief.pdf
  2. https://www.indiatvnews.com/business/news-fabiflu-tablets-dosage-covid-19-treatment-favipiravir-glenmark-indian-company-gets-approval-628184
  3. https://www.livemint.com/market/mark-to-market/glenmark-s-fabiflu-is-first-in-the-market-but-growth-opportunity-limited-11592810808435.html
  4. https://www.indiatoday.in/india/story/coronavirus-treatment-drug-glenmark-fabiflu-favipiravir-launch-india-rs-103-per-tablet-reduce-viral-load-1691066-2020-06-20
  5. https://indianexpress.com/article/india/glenmark-to-market-the-antiviral-under-the-brand-name-fabiflu-6470539-6470539/
  6. Du YX, Chen XP. Favipiravir: Pharmacokinetics and Concerns About Clinical Trials for 2019-nCoV Infection [published online ahead of print, 2020 Apr 4]. Clin Pharmacol Ther. 2020;10.1002/cpt.1844. doi:10.1002/cpt.1844 

লেখক পরিচিতিঃ 

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী, পি.এইচ.ডি

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী দিল্লি-র অ্যামিটি ইউনিভার্সিটি-তে ভাইরোলজি এবং ইমিউনোলজি বিভাগে  অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন। উনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যান্সার বায়োলজিতে পিএইচডি এবং পরবর্তীকালে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া-র স্কুল অফ মেডিসিন-এ এবং সিটি অফ হোপ ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট-এ (ক্যালিফর্নিয়া) ভাইরাল অনকোলজি বিষয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। সম্প্রতি লেখক অধ্যাপনা, লেখালিখি, ক্যান্সার গবেষণা ও সচেতনতা প্রসারের কাজে যুক্ত।

Write your comments

%d bloggers like this: