ডেক্সামিথাসোনঃ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হোল করোনা সংক্রমণের জীবনদায়ী ওষুধ – ক্লিনিকাল ট্রায়াল তথ্য

Reading Time: 4 minutes

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী জুন ১৮, ২০২০

অতিমারী নভেল করোনাভাইরাসের প্রবল সংক্রমণে যখন বিপর্যস্ত গোটা পৃথিবী, মানুষের দৈনিক মৃত্যুমিছিল যখন অব্যাহত, সেই সময়ে আশার আলো দেখাচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক সাম্প্রতিকতম  গবেষণা। স্টেরয়েড ডেক্সামিথাসোন- নামের এক ওষুধের প্রয়োগে সেরে উঠছেন মুমূর্ষু করোনা আক্রান্ত রোগী, এমনটিই দাবী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের। 

কি এই ডেক্সামিথাসোন ?

চিকিৎসায় ও গবেষণায়  ডেক্সামিথাসোন এর ব্যাবহার নতুন ঘটনা নয়। ১৯৬০ সালের শুরু থেকেই এই ডেক্সামিথাসোন রিউম্যাটয়েড আর্থারাইটিস এবং অ্যাস্থমার চিকিৎসায় ব্যাবহৃত হতে শুরু করে। প্রকৃতপক্ষে এই রাসায়নিক যৌগটি একটি সিনথেটিক স্টেরয়েড। যা ‘গ্লুকোকর্টিকয়েড’ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই ডেক্সামিথাসোন ওষুধটির অনেক কার্যকরী ক্ষমতার পরিচয় আগেই জানা গেছে। ওষুধটি শরীরের প্রদাহজনিত জ্বালা কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এই ওষুধ শরীরের অনাক্রম্যতা বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কিছুটা কম করে দেয়। এর প্রভাবে, শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের প্রদাহ জনিত ক্ষতির পরিমান কমতে থাকে। গবেষণায় আরও দেখা যায়, এটি অণুজীব ঘটিত সংক্রমণ কমাতেও বেশ কার্যকরী ভূমিকা নেয়।

ডেক্সামিথাসোন করোনা সংক্রমণে জীবনদায়ী হয়ে উঠলো কিভাবে?  

নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর সংক্রমণের হার অত্যাধিক। প্রায় সমস্ত বয়সের মানুষ দ্রুত এই সংক্রমণে অসুস্থ হন। বিশেষ করে ৬৫ বছরের উর্ধে থাকা প্রবীণরা এবং উচ্চ রক্তচাপ, ফুসফুসের সমস্যা, ডায়াবেটিস ইত্যাদি উপসর্গে  নভেল করোনা সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারন করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, জরুরি অবস্থায় রোগীকে পর্যাপ্ত অক্সিজেন এবং ভেন্টিলেশানে রাখতে হয়। এখনো পর্যন্ত, প্রচলিত চিকিৎসা ব্যাবস্থায় কোন ভ্যাকসিন, কোন কার্যকরী ওষুধ না থাকায় চিকিৎসকের কাছে এই রোগের চিকিৎসা রীতিমত চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। কিছুদিন আগেই করোনা চিকিৎসায় প্রকৃতপক্ষে ম্যালেরিয়ায় ব্যাবহৃত ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন এবং এইডস রোগে ব্যাবহৃত অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ রেমসেডেভির নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরিক্ষা চালানো হয়। এমনকি ট্রায়াল হিসাবে ওই ওষুধগুলির বেশ কিছুটা ব্যাবহারও শুরু হয়। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন হৃদপিণ্ডের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। অপরদিকে, রেমসেডেভির করোনা সংক্রমণে রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার হার কিছুটা হলেও ত্বরান্বিত করে। কিন্তু রেমসেডেভির ওষুধের ব্যাবহার এখনো পরীক্ষামূলক স্তরে সীমাবদ্ধ।

ঠিক এই সময়েই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আশার আলো দেখালেন করোনা চিকিৎসায় ডেক্সামিথাসোন প্রয়োগ করে। ব্রিটেনে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এই গবেষণার নাম ছিল-“রিকভারি”। বস্তুত, এই “রিকভারি” প্রোজেক্ট ছিল ন্যাশনাল ইন্সিটিউট অফ হেল্‌থ রিসার্চ (NIHR) থেকে অনুদান প্রাপ্ত। “রিকভারি” (RECOVERY) প্রোজেক্ট এর পুরো নাম হোল- ‘র‍্যাণ্ডামাইজ ইভ্যালুয়েশান অফ কোভিড-১৯ থেরাপি’(RANDOMIZE EVALUATION OF COVID-19 THERAPY)।  এই গবেষণায় মূলতঃ কোভিড-১৯ সংক্রমিত রোগীদের উপর স্বল্প ডোজে  ডেক্সামিথাসোনের প্রভাব দেখা হচ্ছিলো। NIHR এর চিফ মেডিকেল অফিসার অধ্যাপক ক্রিস হুইটি জানিয়েছেন, যে পৃথিবীব্যাপী সমস্ত  কোভিড-১৯ সংক্রান্ত গবেষণার মধ্যে এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফল ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রোজেক্টের প্রধান অধ্যাপক পিটার হরবি এবং সহকারী প্রধান অধ্যাপক মার্টিন ল্যানড্রের মতে, ডেক্সামিথাসোনের প্রয়োগে ভেন্টিলেশানে থাকা রোগী মৃত্যুর হার এক তৃতীয়াংশ এবং অক্সিজেন সাপোর্টে থাকা রোগী মৃত্যুর হার এক পঞ্চমাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণায়, হাসপাতালের প্রায় দুইহাজার করোনা আক্রান্ত রোগীর উপর এই ওষুধ পরীক্ষা করে আশাপ্রদ ফল মিলেছে। 

কিভাবে কাজ করে এই ডেক্সামিথাসোন?

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। রক্তে অবস্থিত বিভিন্ন কোষ, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যাবস্থার সাথে যুক্ত, তারা অস্বাভাবিক হারে প্রোটিন- ‘সাইটোকাইন’ নিঃসৃত করতে থাকে। এই পুরো ঘটনাটিকে, চিকিৎসার পরিভাষায় ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’ বলা হয়।এর প্রভাবে শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গগুলির দ্রুত ক্ষতি হয় এবং অঙ্গগুলি একের পর এক অকেজো হয়ে রোগীর মৃত্যু হয়।  ডেক্সামিথাসোন এই প্রাণঘাতী পরিস্থিতিকে অনুকূলে নিয়ে আসে এবং শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। 

ডেক্সামিথাসোন চিকিৎসাঃ ব্যায়সাধ্য না সুলভ?   

কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে, ইতিপূর্বে যে সমস্ত ওষুধের ব্যাবহার হয়েছে, তার চিকিৎসা যথেষ্ট ব্যায়বহুল। এই ক্ষেত্রে, ডেক্সামিথাসোন একটি ব্যাতিক্রম। এই ওষুধ সুলভ ও সহজলভ্য। অধ্যাপক মার্টিন ল্যানড্রে এ বিষয়ে জানিয়েছেন, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমনে ডেক্সামিথাসোন টানা ১০ দিন ব্যাবহার করতে হয়। এতে প্রতি রোগীর জন্যে খরচ হয় মাত্র ৫ পাউণ্ড। ফলে এই চিকিৎসা মানুষের সাধ্যের মধ্যে। তবে, গবেষকদের সাবধানবানী হোল, উপসর্গ বিহীন অবস্থায় বা করোনার মৃদু উপসর্গে এই ওষুধ কাজ করবে না। বিশেষ করে যাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কোন সমস্যা নেই, তাদের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ফলপ্রসূ হবে না। তাই, ব্রিটেনের গবেষকদের এই মূল্যবান আবিষ্কার, বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলিকে করোনা চিকিৎসায় বিশেষ ভাবে সাহায্য করবে বলে আশা করা যায়। তাই আমরা চোখ রাখবো আমাদের দেশের ড্রাগ রেগুলেটরি অফিস ডেক্সামিথাসোন কে ইমার্জেন্সি মেডিসিন ব্যবহার করার অনুমতি দিচ্ছে কিনা।

তথ্যসূত্রঃ 

  1. https://www.who.int/news-room/detail/16-06-2020-who-welcomes-preliminary-results-about-dexamethasone-use-in-treating-critically-ill-covid-19-patients
  2. https://www.nihr.ac.uk/news/first-drug-to-reduce-mortality-in-hospitalised-patients-with-respiratory-complications-of-covid-19-found/25061
  3. https://www.recoverytrial.net/
  4. Caly L, Druce JD, Catton MG, Jans DA, Wagstaff KM. The FDA-approved drug ivermectin inhibits the replication of SARS-CoV-2 in vitro. Antiviral Res. 2020 Jun;178:104787. doi: 10.1016/j.antiviral.2020.104787. Epub 2020 Apr 3. PMID: 32251768; PMCID: PMC7129059.
  5. Tisoncik JR, Korth MJ, Simmons CP, Farrar J, Martin TR, Katze MG. Into the eye of the cytokine storm. Microbiol Mol Biol Rev. 2012 Mar;76(1):16-32. doi: 10.1128/MMBR.05015-11. PMID: 22390970; PMCID: PMC3294426.

লেখক পরিচিতিঃ 

Dr. Shuvomoy Banerjee
ডঃ শুভময় ব্যানার্জী

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী দিল্লি-র অ্যামিটি ইউনিভার্সিটি-তে ভাইরোলজি এবং ইমিউনোলজি বিভাগে  অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে অধ্যাপনা করেছেন। উনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্যান্সার বায়োলজিতে পিএইচডি এবং পরবর্তীকালে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভানিয়া-র স্কুল অফ মেডিসিন-এ এবং সিটি অফ হোপ ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট-এ (ক্যালিফর্নিয়া) ভাইরাল অনকোলজি বিষয়ে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। সম্প্রতি লেখক অধ্যাপনা, লেখালিখি, ক্যান্সার গবেষণা ও সচেতনতা প্রসারের কাজে যুক্ত।  

Write your comments

%d bloggers like this: