কিছুক্ষেত্রে SARS-CoV-2 সংক্রমনে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে জমাট বাঁধছে রক্ত: গবেষণা তথ্য

Reading Time: 4 minutes

ডঃ শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ বাংলার প্রতিবেদন, আগস্ট ১৬, ২০২০

কোভিড-১৯ রোগীর শারীরিক অসুস্থতা সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় প্রধানত নিউমোনিয়া এবং ইমিউনিটির অতি সক্রিয়তার ফলে তৈরী হওয়া ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’। বর্তমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে প্রথম দুটি উপসর্গ ছাড়াও রোগীর ফুসফুস, হৃদপিন্ড, বৃক্ক সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির শিরা-উপশিরা ও ধমনীপথে জমাট বাঁধছে রক্ত। যার ফলে অস্বাভাবিক হচ্ছে রক্ত চলাচল এবং বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটছে রোগীর। কোভিড-১৯ রোগে মৃত্যু ঘটলে, অনুমতি সাপেক্ষে রোগীর শরীর “অটোপ্সি” করে দেখা হয়। সেই সময়ে এই বিশেষ ঘটনা বিজ্ঞানীদের নজরে আসে।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গন মেডিক্যাল সেন্টারের ডিপার্টমেন্ট অফ প্যাথলজির চেয়ারম্যান ডঃ অ্যামি রেপকিউইকস জানিয়েছেন অটোপ্সি করে তাঁরা রোগীর শরীরে ছোট, বড়ো সমস্ত রক্তবাহে রক্ততঞ্চনের প্রমান পেয়েছেন। এছাড়া তাঁরা হৃদপিন্ড, বৃক্ক ও যকৃতে বিশেষ ‘মেগাক্যারিওসাইটের’ (এক ধরণের ইমিউন কোষ, যা কেবলমাত্র বোনম্যারো এবং ফুসফুসে পাওয়া যায়) উপস্থিতি দেখেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে অস্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁদের মতে, মেগাক্যারিওসাইট অনুচক্রিকা তৈরীতে সাহায্য করে। অনুচক্রিকা রক্ততঞ্চনে বিশেষ ভূমিকা নেয়, ফলে বিজ্ঞানীদের অনুমান নভেল করোনা ভাইরাস শরীরে যেভাবে সাইটোকাইন স্টর্ম তৈরী করে মারাত্মক প্রদাহের সৃষ্টি করে, তার প্রভাবে মেগাক্যারিওসাইট ও অনুচক্রিকা বিভিন্ন অঙ্গের রক্তবাহে রক্ততঞ্চন করতে থাকে এবং রোগীর পরিস্থিতিকে আশঙ্কাজনক করে তোলে। ডঃ অ্যামি রেপকিউইকসের এই গবেষণা ‘দ্য ল্যান্সেট জার্নাল ই-ক্লিনিক্যাল মেডিসিন’ গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। 

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে।

রক্ততঞ্চন কোভিড১৯: পারস্পরিক সম্পর্ক

চিকিৎসাবিজ্ঞানে সংক্রমনের সাথে রক্ততঞ্চনের সম্পর্ক নতুন ঘটনা নয়। বস্তুতঃ যেকোনো ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাকের সংক্রমনে শরীরে কিছুমাত্রায় রক্ততঞ্চন হতে পারে। কিন্তু রক্ততঞ্চনের মাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়ে যদি “ডিসেমিনেটেড ইন্ট্রাভ্যাস্কুলার কোয়াগুলেশান (DIC)” তৈরী করে তবে সেই পরিস্থিতিতে রক্তবাহে রক্ত তঞ্চিত হয়ে প্রবল শারীরিক অসুস্থতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যদি শরীরে প্রদাহজনিত সমস্যায় রক্ততঞ্চন বেড়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো প্রদাহ এবং রক্ততঞ্চন উভয়মুখী। অর্থাৎ প্রদাহ যেমন রক্ততঞ্চন ঘটায় তেমন রক্ত তঞ্চিত হয়ে প্রদাহজনিত বিক্রিয়া কমিয়ে দেয়। কিন্তু কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে বিষয়টি খুব স্পষ্ট নয়। কারণ, SARS-CoV-2 আক্রান্ত রোগীর শরীরে বিভিন্ন ধাপে ইমিউন রেস্পন্স দেখা যায়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে প্রথম দিকে রক্তে প্রো-ইনফ্লামেটরি সাইটোকাইনগুলির (যেমন- IL-6, IL-1, TNF-alpha) মাত্রা বেড়ে গিয়ে ‘সাইটোকাইনেমিয়া’ এর উপসর্গ দেখা দেয় কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই তা কমে যায়। প্রবল কোভিড-১৯ উপসর্গে একই সাথে বিভিন্ন অঙ্গের রক্তবাহে রক্ততঞ্চন শুরু হয় ভাইরাস সংবহনকে বন্ধ করার জন্যে। একই সাথে শুরু হয় ‘সাইটোকাইন স্টর্ম’, যার প্রভাবে বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে ও রোগীর মৃত্যু হয়। এই প্রসঙ্গে উইল করনেল মেডিসিনের ডিভিশন অফ হেমাটোলজি অ্যান্ড মেসিক্যাল অনকোলজির অধ্যাপক ডঃ জেফ্রি লরেন্স এবং তাঁর সহযোগী নিউইয়র্ক প্রেসবাইটেরিয়ান মেডিক্যাল সেন্টারের অনকোলজি বিশেষজ্ঞদের গবেষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোভিড-১৯ উপসর্গে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক রোগীর মধ্যেই ফুসফুস, মস্তিষ্কের রক্তবাহে রক্ত জমাট বাঁধার লক্ষন দেখা যাচ্ছে। কিছু রোগীর মস্তিষ্কে রক্ততঞ্চনের ফলে স্ট্রোক হয়েছে। চিকিৎসকরা রক্ত লঘুকরণের ওষুধ (Blood Thinner drugs, এক্ষেত্রে হেপারিন) অধিকমাত্রায় প্ৰয়োগ করেও বিশেষ ফল পান নি। ডঃ লরেন্সের মতে, অতি দ্রুত এবং ভয়াবহ এই রক্ততঞ্চনের পিছনে বিশেষ বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। তিনি ও তাঁর গবেষকদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আবিষ্কৃত হয়েছে এক চমকপ্রদ তথ্য, তা হলো রক্তবাহে জমাট বাঁধা রক্তপিন্ডে পাওয়া গেছে “কমপ্লিমেন্ট” প্রোটিন। এই প্রোটিন ইমিউন সিস্টেমে ‘ক্যাসকেড রিঅ্যাকশন’ এর মাধ্যমে জীবাণু সংক্রমিত কোষকে মেরে ফেলে এবং রক্ততঞ্চনে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, রক্ততঞ্চন কমাতে সাহায্যকারী রক্তের অন্যান্য প্রোটিনের কাজকে প্রতিহত করে এই কমপ্লিমেন্ট প্রোটিন। গবেষকরা দেখেছেন, SARS-CoV-2 এর স্পাইক প্রোটিনের সাথে কমপ্লিমেন্ট MASP-2 প্রোটিনের আণবিক সংযোগের (Molecular Interaction) ফলে ‘কমপ্লিমেন্ট ক্যাসকেড’ বিক্রিয়া শুরু হয়। এই বিক্রিয়ার জন্যে দ্রুত রক্ত তঞ্চিত হতে থাকে। গবেষকদের এই কাজ “ট্রান্সলেশানাল রিসার্চ” গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। 

বর্তমানে কোভিড-১৯ জনিত রক্ততঞ্চনের সমস্যায় বিজ্ঞানীদের একান্ত প্রচেষ্টা বিশেষ ব্লাড থিনার ড্রাগ ব্যবহার করে কিভাবে রোগীর শরীরে রক্ততঞ্চনের আগেই তা থামানো যায়। ইতিমধ্যেই ডঃ জেফ্রি লরেন্স ‘আর্গাট্রোব্যান’ ওষুধের সাহায্যে রক্ততঞ্চনের গবেষণা শুরু করেছেন। এছাড়া, আমেরিকা ও ইটালির গবেষকরা অ্যান্টি-কমপ্লিমেন্ট ড্রাগ ‘একিউলিজুম্যাব’ এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা করছেন। পৃথিবীর মানুষ এই গবেষণার দিকে অধীর আগ্রহের সাথে চেয়ে আছেন।

খুব তাড়াতাড়ি বাংলায় আসছে অনলাইনে এক অভিনব ডাক্তার পরিষেবা – সঙ্গে থাকুন
বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন neucradhealth@gmail.com
Panel discussion with Doctors (ডাক্তার ও উপদেশ )

তথ্যসূত্রঃ 

  1. Rapkiewicz AV, Mai X, Carsons SE, et al. Megakaryocytes and platelet-fibrin thrombi characterize multi-organ thrombosis at autopsy in COVID-19: A case series. EClinicalMedicine. 2020;24:100434. Published 2020 Jun 25. doi:10.1016/j.eclinm.2020.100434
  2. Lax SF, Skok K, Zechner P, et al. Pulmonary Arterial Thrombosis in COVID-19 With Fatal Outcome: Results From a Prospective, Single-Center, Clinicopathologic Case Series [published online ahead of print, 2020 May 14]. Ann Intern Med. 2020;M20-2566. doi:10.7326/M20-2566
  3. Buja LM, Wolf DA, Zhao B, et al. The emerging spectrum of cardiopulmonary pathology of the coronavirus disease 2019 (COVID-19): Report of 3 autopsies from Houston, Texas, and review of autopsy findings from other United States cities. Cardiovasc Pathol. 2020;48:107233. doi:10.1016/j.carpath.2020.107233
  4. Magro C, Mulvey JJ, Berlin D, et al. Complement associated microvascular injury and thrombosis in the pathogenesis of severe COVID-19 infection: A report of five cases. Transl Res. 2020;220:1-13. doi:10.1016/j.trsl.2020.04.007
  5. Noris M, Benigni A, Remuzzi G. Kidney Int. 2020 Aug; 98(2):314-322. Epub 2020 May 24.
  6. Ackermann M, Verleden SE, Kuehnel M, Haverich A, Welte T, Laenger F, Vanstapel A, Werlein C, Stark H, Tzankov A, et al. N Engl J Med. 2020 Jul 9; 383(2):120-128. Epub 2020 May 21.

Write your comments

You may have missed

%d bloggers like this: