অণুজীব নিয়ন্ত্রণ করে অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে বিশেষ আন্তঃসম্পর্ক

Reading Time: 3 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, এপ্রিল ৩, ২০২১

মানুষের জন্মের সময়ে তার পৌষ্টিকনালীতে কোন অণুজীব (Microbes) দেখা যায় না। জন্মের পরে, মানবশিশু যখন খাদ্য গ্রহন করতে থাকে তখন থেকে তার অন্ত্রে বিভিন্ন প্রকার অণুজীবের সমাবেশ ঘটতে থাকে। এদের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া, ছত্রাক ইত্যাদি প্রধান। শুনে চমকে উঠবেন না যেন, কারন এই সব বেশীরভাগ অণুজীব শরীরের কোন ক্ষতি করে না বরং এদের অভাবে দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে। আশ্চর্যের কথা, সারা দেহের মধ্যে মানুষের অন্ত্র হোল অণুজীবগুলির সবচেয়ে বড় বাসস্থান। অন্ত্রে বসবাসকারী অনুজীবগুলি দেহের বিভিন্ন শারীরবৃত্তিয় ক্রিয়া সম্পাদন করে থাকে এবং এদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হোল মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ স্থাপন। বৈজ্ঞানিকদের মতে, মানুষের অন্ত্র হোল তার ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’, যাকে বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে এনটেরিক নার্ভাস সিস্টেম (ENS)। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্ক যেমন অন্ত্রকে সংকেত দেয়, তেমনই অন্ত্রের অণুজীবরাও মস্তিষ্ককে প্রয়োজনীয় সংকেত দেয়। আসুন, জেনে নি, অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে বিশেষ আন্তঃসম্পর্কের কথা। 

কিভাবে অন্ত্র মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ করে

  • বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যায়, যে সব মানুষ ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম (IBS), গ্যাস, বদহজম, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়েরিয়া ইত্যাদি অসুখে ভোগেন, তাদের মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। আসলে ENS মস্তিষ্কে বিরক্তিপ্রবনতা, ও মানসিক পরিবর্তনের সংকেত দেয়। 
  • অন্ত্রের অণুজীবগুলি ক্রমাগত স্নায়ুতন্ত্র, ইমিউন ও হরমোন সিস্টেমের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে সংকেত দিতে থাকে। 
  • অন্ত্রের অণুজীবগুলি দেহের বিপাক, এমনকি স্নায়ুকোষের নিউরো-ট্রান্সমিটারগুলির বিপাকেও বিশেষ ভূমিকা নেয়। 
  • অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠী (Gut Microbiota) বিভিন্ন নিউরো অ্যাকটিভ যৌগ তৈরি করে, তারা স্নায়ুকোষের কাজ এবং ‘নিউরোপ্লাসটিসিটি’ নিয়ন্ত্রণ করে। 
  • দেখা গেছে, অণুজীবগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ‘হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল অ্যাক্সিস’ এর কাজ নিয়ন্ত্রণ করা। এর প্রভাবে দেহের স্ট্রেস রেস্পন্সের হের-ফের ঘটে মানসিক অবসাদ হতে পারে। 
  • অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠীর কার্যকারিতার পরিবর্তনের ফলে বহু স্নায়বিক রোগের উৎপত্তি হয়, যেমন- মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, পারকিন্সনস ডিসিস, অ্যালঝাইমারস ডিসিস ইত্যাদি।
  • বৈজ্ঞানিকরা ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করে দেখেছেন, অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠী স্ট্রেস ও ব্যাথার অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। 
  • বর্তমানে, আরও জানা যাচ্ছে, অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠী মস্তিষ্কের গঠন ও কাজের বিশেষ নিয়ন্ত্রক, কারন তারা মস্তিষ্কের প্রদাহ, ব্লাড-ব্রেন-ব্যারিয়ারের কাজ, স্নায়ুকোষের ইমিউনিটিকে প্রভাবিত করতে পারে। 
  • অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠীর স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলে, স্নায়ুকোষের প্রদাহ শুরু হয়। এর বৈজ্ঞানিক কারন হোল, অণুজীবরা কোষের রি-অ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস বা ROS কে কমিয়ে দেয়, ফলে কোষের কোন ক্ষতি হয় না। তাই অণুজীবগোষ্ঠীর স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হলেই, ROS স্নায়ুকোষের ক্ষতি করে নিউরো-ডিজেনেরেটিভ রোগ সৃষ্টি করে।       
“একজন গবেষক বিজ্ঞানী হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান, গবেষণা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর – আপনার স্বাস্থ্য সচেতনতা আপনাকে বিপদের সময় পথ দেখাবে” – বিশ্বরূপ ঘোষ, নিউক্র্যাড হেলথ ফাউন্ডার । আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি গবেষক বিজ্ঞানী বিশ্বরূপ ঘোষ তার স্টার্ট আপ প্রচেষ্টা করছেন বাংলা তথা ইন্ডিয়াতে। খুব শীঘ্র নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর ডিজিটাল ডাক্তার প্লাটফর্ম শুরু হবে। আপনাদের আশীর্বাদ কামনা করি।

মানুষের মস্তিষ্ক কিভাবে অন্ত্রের কাজকে প্রভাবিত করে? 

  • মস্তিষ্কের কোন বস্তুকে অনুধাবন করার ক্ষমতা, অনুভূতির সঠিক প্রকাশ, ব্যাবহার, ব্যাথা ইত্যাদির কাজে ব্যাঘাত হলে অন্ত্রের কোষগুলিতে প্রদাহ শুরু হয়। 
  • মস্তিষ্কের কোন অংশে ক্ষতি হলে অন্ত্রের অণুজীবগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য পরিবর্তিত হতে পারে।
  • গবেষণায় জানা যাচ্ছে, ENS আমাদের খাদ্য গ্রহন, চর্বণ, পরিপাক, পুষ্টি উপাদান শোষন, আত্তীকরণ ইত্যাদি কাজে সাহায্য করে থাকে। 
  • ENS বমির ভাব ও বমি করার শারীরবৃত্তীয় কৌশলকে নিয়ন্ত্রণ করে। মস্তিষ্কের মেডুলা অবলংগাটা থেকে স্নায়বিক সংকেত পাকস্থলী ও খাদ্যনালীতে গিয়ে পৌছয় এবং ‘ভমিটিং রিফ্লেক্স’ তৈরি করে, ফলে বমি হয়। 
  • ENS অন্ত্রের ইমিউনিটিকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। 

চিকিৎসার নিরিখে অন্ত্র-মস্তিষ্কের আন্তঃসম্পর্কঃ

সাম্প্রতিক কালে অন্ত্র-মস্তিষ্কের আন্তঃসম্পর্ক আবিষ্কার হওয়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে। এতে আমরা মস্তিষ্কের নান রোগ, স্নায়বিক জটিলতা, মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি রোগ উপসর্গ বোঝার সাথে সাথে অন্ত্রের কোন অণুজীবগোষ্ঠীর প্রভাবে সেগুলি হচ্ছে তা নির্ণয় করতে পারি। জন হপকিন্স সেন্টার ফর নিউরো-গ্যাসট্রোএনটেরোলজির প্রধান ডঃ জে প্যাসরিচা বলেছেন, “আমাদের শরীরে অবস্থিত আসলে ‘দুটি মস্তিষ্ক’ একে অন্যের সাথে কথা বলে। ফলে একটি মস্তিষ্কের চিকিৎসায় অপরটির কোন সাহায্য হতে পারে”। মানসিক রোগের চিকিৎসায় (যেমন- কগ্নিটিভ বিহেভিয়ার‍্যাল থেরাপি) এই দুই মস্তিষ্কের কাজে যথেষ্ট ভারসাম্য আনতে পারে। আবার, অন্ত্রের কোন রোগে ‘প্রোবায়োটিক’ ব্যাবহারে দেখা গেছে স্ট্রেস, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি কমে যায়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা যায়, প্রোবায়োটিক স্ট্রেস কর্টিসল রেস্পন্সকে প্রভাবিত করে। তবে, এই বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন যাতে আরও উন্নত এবং সাফল্যজনক চিকিৎসার ব্যাবস্থা করা যায়।    

Explore & Subscribe Bengali Health YouTube Channel 

তথ্য সুত্রঃ 

  1. Martin CR, Osadchiy V, Kalani A, Mayer EA. The Brain-Gut-Microbiome Axis. Cell Mol Gastroenterol Hepatol. 2018;6(2):133-148. Published 2018 Apr 12. doi:10.1016/j.jcmgh.2018.04.003
  2. Galland L. The gut microbiome and the brain. J Med Food. 2014;17(12):1261-1272. doi:10.1089/jmf.2014.7000
  3. Sudo N. Role of gut microbiota in brain function and stress-related pathology. Biosci Microbiota Food Health. 2019;38(3):75-80. doi:10.12938/bmfh.19-006
  4. Mayer EA, Knight R, Mazmanian SK, Cryan JF, Tillisch K. Gut microbes and the brain: paradigm shift in neuroscience. J Neurosci. 2014;34(46):15490-15496. doi:10.1523/JNEUROSCI.3299-14.2014
  5. Al-Asmakh M, Anuar F, Zadjali F, Rafter J, Pettersson S. Gut microbial communities modulating brain development and function. Gut Microbes. 2012;3(4):366-373. doi:10.4161/gmic.21287
  6. Ochoa-Repáraz J, Kasper LH. The Second Brain: Is the Gut Microbiota a Link Between Obesity and Central Nervous System Disorders?. Curr Obes Rep. 2016;5(1):51-64. doi:10.1007/s13679-016-0191-1

Write your comments

%d bloggers like this: