শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন এবং প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা – স্বাস্থ্য ও সমাজ

Reading Time: 3 minutes

অনুরুপা ঘোষ, এপ্রিল ১৭, ২০২১

আধুনিক সভ্যতার অনেকগুলি অভিশাপের অন্যতম হলো শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন-যার পেছনে সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণের সাথে সাথে মানসিক কারণও বহুলাংশে দায়ী। বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন শিশু যার মধ্যে ছেলে ও মেয়ে উভয়ই আছে,যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এর মধ্যে আমেরিকার মতো প্রথম বিশ্বের দেশ যেমন আছে তেমনি ভারতবর্ষের মতো উন্নয়নশীল দেশও আছে। আমেরিকার মতো দেশে এই ধরনের নির্যাতনের পেছনে তাদের জীবনযাত্রার ধরন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার অনেকাংশে দায়ী। আমেরিকায় যে শিশুরা সুস্থ ও সচ্ছল পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেখানেও এই ধরনের ঘটনা ঘটে, নানা রকম কারণের মধ্যে একটি হলো প্রায় প্রতিটি পরিবারেই বাবা-মা দুজনেই নিজেদের পেশাগত কারণে পরিবারে সময় বেশি দিতে পারেন না। শিশুটি বেবিসিটার এর তত্ত্বাবধানে থাকে এবং সব সময় যে নিরাপদে থাকে এমন দাবি করা যায় না। এত ছোট শিশুরা যৌন নির্যাতিত হয় তাদের রক্ষাকর্তা দের মানসিক বিকৃতির কারণে,যা হয়তো অনেক পরে বাবা মা বুঝতে পারেন। এর ফলে যে শিশুটি 6 বছর বয়সের আগে যৌন নির্যাতিত হয়েছে তার একটি ভয়ঙ্কর মানসিক সমস্যা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে আত্মহত্যা করার প্রবণতা তৈরি হয়।

David Finkelhor (Director of the Crimes Against Children Research Center) এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী 2010 সালে আমেরিকাতে প্রতি ৫ জনে ১টি মেয়ে শিশু এবং প্রতি ২০ জনে ১ টি ছেলে শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার। আমেরিকার বিখ্যাত Mayo Clinic এর চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন কয়েকটি লক্ষণ যা বাবা-মায়েরা বুঝতে পারবেন-

  • যৌন আচরণ বা জ্ঞান যা সন্তানের বয়সের জন্য অনুপযুক্ত।
  • গর্ভাবস্থা বা যৌন সংক্রমণ।
  • বাচ্চার অন্তর্বাসের মধ্যে রক্ত।
  • মানসিক বিষন্নতা,আতঙ্ক,অনিদ্রা,খাদ্যে অনাগ্রহ।
  • বাবা মাকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে নিরাপত্তা ও স্নেহের সন্ধান করা।
  • সর্বোপরি আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের চরম ক্ষতি।

তাই Mayo Clinic এর চিকিৎসকরা শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, সেগুলি তুলে ধরলাম।

  • সন্তানকে সময় দিন।
  • বেবিসিটার দের তদারকিতে পুরোপুরি নির্ভরশীল হবেন না। অনিয়মিত ভাবে বাড়িতে এসে পর্যবেক্ষণ করুন, যাতে শিশুর প্রতি আপনার যত্নশীলতা প্রকাশ পায়।
  • একটু বড় বাচ্চাদের কোন কোন ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে “না” বলতে হবে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া দরকার।
  • এছাড়া বাচ্চাদের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটগুলোতে অত্যধিক আসক্তি থাকলে তাকে সীমাবদ্ধ করা একটি খুবই জরুরি পদক্ষেপ।
“একজন গবেষক বিজ্ঞানী হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান, গবেষণা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর – আপনার স্বাস্থ্য সচেতনতা আপনাকে বিপদের সময় পথ দেখাবে” – বিশ্বরূপ ঘোষ, নিউক্র্যাড হেলথ ফাউন্ডার । আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি গবেষক বিজ্ঞানী বিশ্বরূপ ঘোষ তার স্টার্ট আপ প্রচেষ্টা করছেন বাংলা তথা ইন্ডিয়াতে। খুব শীঘ্র নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর ডিজিটাল ডাক্তার প্লাটফর্ম শুরু হবে। আপনাদের আশীর্বাদ কামনা করি।

আরেকটু বড় হওয়ার সাথে সাথে অবাধ ইন্টারনেটের নেশায় কমবয়সীরা মেতে ওঠে এবং অভিভাবকদের সাথে যথেষ্ট দূরত্ব থাকার দরুন সঠিক রুচি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচুর ভুল হয়, সঙ্গী নির্বাচন ও সঙ্গী পরিবর্তনের মত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গুলিও অপরিণত মন ও বুদ্ধির পরিচয় দেয়-এর ফলস্বরূপ ছেলে-মেয়ে উভয়ই যখন যৌন নির্যাতিত হয় তখন সমাজ ও পরিবারও দায় এড়াতে পারে না।

এছাড়া,আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা অজস্র শিশু শ্রমিকদের মধ্যে যে অপরাধ প্রবণতা তৈরি হয় তাদের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন অত্যাচার এর মধ্যে অন্যতম হলো যৌন নির্যাতন। ভারতেও উপরোক্ত কারণগুলো বর্তমান কিন্তু এর সাথে দারিদ্র্য ও অশিক্ষা মিলেমিশে চরম আকার ধারণ করেছে। ভারতবর্ষ একটি মিশ্র সামাজিক-অর্থনৈতিক সংস্কৃতি সম্পন্ন দেশ। বেশিরভাগ সময়ই এদেশে কম বয়সী ছেলে এবং বিশেষত মেয়েদের যৌন নির্যাতন লুকিয়ে রাখা হয় শিশু ও পরিবারের সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে। এইগুলি হয় প্রধানত গ্রাম ও শহরতলীর মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাই এইসব পরিবারের শিশুদের মধ্যে যৌন নির্যাতনের ভয়ঙ্কর প্রভাব পড়ে। বর্তমানে আশার কথা এই যে,কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিবারের লোকেরা সচেতন হয়ে থানায় যাচ্ছে ও রিপোর্ট করছে অপরাধীর বিরুদ্ধে।

National Crime Record Bureau (NCRB) র রিপোর্ট অনুযায়ী 2018 সালে ভারতে প্রতিদিন 109 জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার। NCRB র তথ্য অনুযায়ী 2017 সালে 32,608টি ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছিল এবং 2018 তে 39,827টি ঘটনা POCSO আইনে রিপোর্ট করা হয়। Protection of Children against Sexual Offences(POCSO) আইনটি 2012 সালে শিশুদের যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে গৃহীত হয়। মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশ এবং তামিলনাড়ু যথাক্রমে এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে প্রথম, যুগ্ম দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে(2018 NCRB)। এদেশে এখনও মেয়েদের কমবয়েসে বিয়ে দেওয়া হয় যদিও 2006 সালে বাল্য বিবাহ বিরোধী আইন হয়েছে এবং ন্যূনতম বিয়ের বয়স নির্ধারিত হয়েছে ছেলের 21 বছর ও মেয়ের 18 বছর। এছাড়া বিভিন্ন NGOদের দ্বারা প্রচার চালানো হচ্ছে,বাচ্চাদের তাদের শরীরের গোপন অঙ্গগুলি সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে-কোথায় স্পর্শ করা যাবে এবং কোথায় স্পর্শ করা যাবে না-এই ব্যাপারে ধারনা দেওয়া হচ্ছে। এই ক্ষেত্রে শিশুদের এটাও শিক্ষা দেওয়া বিশেষভাবে প্রয়োজন যে তাদের শরীরের গোপন অঙ্গ স্পর্শ করা যেমন অপরাধ ঠিক তেমনি তারাও অন্যের শরীরের গোপন অঙ্গ যেন কখনোই স্পর্শ না করে।

Child Rights and You(CRY) এর ডিরেক্টর Priti Mahara র মতে এই to ভয়ঙ্কর অপরাধ থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য আরোও প্রচুর সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন, দরিদ্র পরিবারের বাচ্চারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এবং আর্থিক ও মানসিক দুর্দশার কারণে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে-এই প্রবণতা থেকে অসহায় শিশুদের কে রক্ষা করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।তাই সব শেষে একটি কথাই বলতে পারি এই যে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সর্বস্তরে এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র রাস্তা শিক্ষা,শিক্ষা এবং শিক্ষা।

Explore & Subscribe Bengali Health YouTube Channel 

Write your comments

%d bloggers like this: