অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনে এক নতুন দিশা দেখালো বেঙ্গালুরুর ডাক্তাররা

Reading Time: 3 minutes

নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন

এক অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী থাকলো বিখ্যাত মজুমদার সও ক্যানসার সেন্টার, একটি ছোট্ট চার বছরের তানজানিয়ান বাচ্ছাকে নতুন জীবন দিলো সেন্টারের ডাক্তাররা বিরল রক্তহীন অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে বাচ্ছাটি ছিল পূর্ব আফ্রিকার ‘জিহবা’ সম্প্রদায়ের এবং এঁদের ধর্মীয় আচার অপর ব্যক্তির রক্ত নিয়ে চিকিৎসার বিরুদ্ধে। এমনই একটি আশ্চর্যজনক পরিস্থিতি ডাক্তারদের নিজেদের প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চিন্তাভাবনা করার ইন্ধন দিলো, তাঁরা রোগীর স্বার্থে চিরকাল যেমন ক্ষমতার বাইরে গিয়ে হলেও চেষ্টা চালিয়েছেন এই ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ছোট্ট প্রানটিকে রক্ষার জন্য ডাক্তারবাবুরা এক অনন্য পারদর্শীতার নজির রাখলেন। ইটাই জেমস মোসি নামক ছোট্ট বাচ্ছাটির পেটের ক্যানসার ধরা পরার পর অঙ্কোলজিষ্টরা সর্বপেক্ষা সেরা চিকিৎসা হিসাবে তাকে বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের পরামর্শ দেন। কিন্তু যেহেতু ইটাই তার জন্মগত ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী রক্ত দিতে হবে এমন কোনো চিকিৎসার মধ্যে দিয়ে যেতে অপারগ ছিল সেই হেতু চিকিৎসকরা রক্তের বিনিময়হীন বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের এক অভূতপূর্ব পদ্ধতির আশ্রয় নিলেন।

ইটাই এর চিকিৎসার জন্য ডাক্তাররা কোন পদ্ধতির সাহায্য নিলেন?

সাধারণত যে সমস্ত বাচ্ছারা পেটের ক্যানসার বা লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত তাদের সম্পূর্ণভাবে সুস্থকরে তোলার জন্য অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু ইটাই এর ধর্মাচরণ তাকে তার শরীরে রক্ত দিতে বা নিতে হবে এমন কোনো চিকিৎসার অনুমতি দেয় না। ফলে বাচ্ছাটির বাবা-মা বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি খোঁজে বিদেশের নানা জায়গায় দৌড়ে বেরিয়েছেন এবং অবশেষে ২০১৮ সালে ইটাই তার বাবা ও মা (দুজনেই তথ্য প্রযুক্তিবিদ বা IT Professionals) বেঙ্গালুরুতে আসেন কর্মসূত্রে আর সেখানেই শুরু হয় ইটাই এর চিকিৎসার নতুন অধ্যায়।

রক্ত না দিয়ে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যাল্ট কিভাবে সম্ভব?

২০১৯ সালে স্বনামধন্য মজুমদার সও ক্যানসার সেন্টারে (Majumdar Shaw Cancer Centre) ইটায়ের চিকিৎসা শুরু হয়। অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ ডাক্তারদের একটি টিম সারাক্ষণ ইটাইয়ের শারীরিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ চালাতে থাকে। বেঙ্গালুরুর প্রথিতযশা মেডিক্যাল ইনস্টিটিউটের প্রধান পরিচালক ডাঃ সুনীল ভাট-যিনি আবার একজন পেডিয়াট্রিক অঙ্কোলজিষ্টরাও স্থির করলেন যে ইটাইয়ের শরীর থেকে নেওয়া স্টেম সেল গুলিকে সংগ্রহীত করবেন অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য। স্টেম কোষগুলিকে উদ্ধার করে বা যোগাড় করে সেগুলিকে ল্যাবরেটরিতে পুনরুৎপাদন (Regenerate)  করা হবে। মোটামুটি তিন সপ্তাহের মধ্যেই স্টেম সেলগুলি থেকে নতুন মজ্জা কোষ উৎপাদন হতে থাকবে এবং এটা করার একমাসের মধ্যেই অ্যাবডোমিনাল ক্যানসারের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেয়ে ইটাই ক্রমশ সুস্থ হতে থাকে। এই পুরো চিকিৎসা পদ্ধতিটিতেই কোথাও রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি যদিও চিকিৎসকরা বলেছেন যে এই নতুন পদ্ধতি অনেকবেশী ঝুঁকিপূর্ণ প্রচলিত অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের চেয়ে।

বোনম্যারো (অস্থিমজ্জা) ট্রান্সপ্ল্যান্ট কি?

বোনম্যারো বা অস্থিমজ্জা হলো মানুষের লম্বা হাড়সমূহের অভ্যন্তরে থাকা একধরনের মোটা ও মাংসল কলাকোষ, যেগুলি হেমাটোপয়েটিক স্টেমসেলস্‌ বা HSC (Hematopoietic Stem Cells) বহন করে। যা কিনা লোহিতরক্তকনিকা RBS (Red Blood Cells), শ্বেতরক্তকণিকা WBC (White Blood Cells) এবং অনুচক্রিকার উৎপাদনের সাথে যুক্ত। অনেকসময় দেখা যায় এই মজ্জাকোষগুলি কোনো মৌলিক অসুস্থতা বা কেমোথেরাপির কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হয় অথবা সংক্রামিত হয় এবং সেই অবস্থায় ডাক্তাররা রক্তসঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরে রক্তের স্টেম সেল বা Blood Stem Cells  প্রবেশ করানো হয় যেগুলি মজ্জা কোষগুলির কাছে পৌঁছে তাদের পুনরুজ্জীবীত করে তোলে।

সাধারনতঃ কি কি ধরনের বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়?

প্রধানত দুটি উপায়ে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয় যেমন autologous ও allogeenic transplant.

Autologous transplant

This image has an empty alt attribute; its file name is 1280px-Bone_marrow_biopsy.jpg

এই পদ্ধতিতে ডাক্তাররা রোগীর শরীরের স্টেমসেল সংগ্রহ করে সেগুলি থেকে পরীক্ষাগারে নতুন মজ্জা কোষ তৈরী করে। এই পদ্ধতি কেবলমাত্র তখনই অবলম্বন করা যায় যখন রোগীর অস্থিমজ্জা কোষগুলি পুরোপুরি সুস্থ ও সবল এবং এই পদ্ধতির ট্রান্সপ্ল্যান্ট, রোগীর কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি শুরু হওয়ার আগেই করতে হয়। যদিও পদ্ধতিটি যথেষ্ট জটিল কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় Graft Versus Host Disease (GVHD) এর ঝুঁকি অনেক কম থাকে।

Allogenic Transplants

https://i2.wp.com/upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/2/24/Bone_Marrow_Transplant.png?resize=438%2C369&ssl=1

এই ধরনের পদ্ধতিতে ডাক্তাররা সুস্থ স্টেমসেল এর পুনরুদ্ধার করেন কোনো Genetically matching donor অর্থাৎ জিনগত সাদৃশ্যযুক্ত দাতার থেকে অথবা রোগীর কোনো সুস্থ আত্মীয়ের থেকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় রোগীর খুব কাছের আত্মীয়রাই এগিয়ে আসেন স্টেম সেল দাতা হিসাবে কিন্তু যদি খুব কাছের আত্মীয়ের থেকে পাওয়া না যায় তবে স্টেমসেল ব্যাঙ্কের ডোনার রেজিষ্ট্রেশন থেকে দাতা পাওয়া যায় অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য। দুটি পদ্ধতির মধ্যে Allogeenic transplant পদ্ধতিটি ডাক্তারদের কাছে বেশী গ্রহণযোগ্য যখন রোগী নিজের শরীরে সুস্থ বোনম্যারোর অভাব থাকে। যদিও এই পদ্ধতিতে GVHD র ঝুঁকি অনেকবেশী এবং এইক্ষেত্রে রোগীকে Immune – Suppressant  Medicine দেওয়া হয় তার কারণ আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক যেসব অ্যান্টিবডিগুলি তৈরী হয় যারা বাইরের থেকে শরীরে প্রবেশ করা দুষ্টু বা ক্ষতিকারক অ্যান্টিজেন (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, প্রোটোজোয়া ইত্যাদি) গুলিকে ধ্বংস করে শরীরকে সুস্থ রাখে তারাই বাইরের স্টেমসেল গুলিকেও আক্রমণ করতে পারে ফলে allogeenic transplant পদ্ধতিটি অকেজো হয়ে যেতে পারে, তাই ডাক্তারবাবুরা রোগীর immunity কে Suppressed করে রাখেন কিছুসময়ের জন্য।

Write your comments

%d bloggers like this: