মে 26, 2024

সারভিক্যাল ক্যানসার – একটি সর্তকবার্তা: নিউক্র্যাড হেলথ

Reading Time: 3 minutes

বিশ্বরূপ ঘোষ, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ, মে ১০, ২০২৩

আজ পৃথিবীর বহু মহিলা জরায়ু মুখের ক্যান্সার বা সারভিক্যাল ক্যানসারে আক্রান্ত। ওয়ার্ল্ড হেল্‌থ অরগ্যানাইজেসন্‌ বা WHO এর রির্পোট অনুযায়ী যতরকমের ক্যানসার আছে তার মধ্যে এই ধরনের ম্যালিগন্যান্সি, সংঘটিত হবার হারের দিক থেকে চতূর্থতম এবং অঙ্কোলজিষ্টরা শুধুমাত্র ২০১৮ সালেই ৫৭০০০০টি নতুন সারভিক্যাল ক্যানসারের কেস নথিভুক্ত করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে মহিলাদের মধ্যে হওয়া ক্যানসারের ৬.৬% হল জরায়ুমুখের।

যে কোনো মহিলারাই এই রোগের শিকার হতে পারেন তবুও লক্ষ্য করা গেছে যে সাধারণত ২১ বছরের বেশী যে সব মহিলাদের এই রোগটির পারিবারিক ইতিহাস আছে তাঁরাই বেশী মাত্রায় আক্রান্ত হন। কিছু মহিলার ক্ষেত্রে আবার দেখা যায় দীর্ঘদিন Human Papillomavirus (HPV) ইনফেকসন্‌ এ ভুগলে, তাঁদের ও জরায়ু মুখে এই ম্যালিগন্যান্সি হানা দিতে পারে।

আশার কথা হলো একমাত্র এই মারাত্বক ক্যানসারের ই টীকা আবিস্কৃত হয়েছে এবং দেখা গেছে সঠিক বয়সে এই টীকা নেওয়া থাকলে তা মহিলাটির সারভিক্সে ক্যানসারে রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করে।

সারভিক্যাল ক্যানসারের উপসর্গগুলিঃ-

সাধারণত নীচের উপসর্গগুলিকে এই ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ বলে ধরে নেওয়া হয়।

  • দুটি মাসিক এর মধ্যবর্তী সময়ে রক্তপাত। 
  • পোষ্টমেনোপজাল রক্তপাত বা মেনোপজ হবার পরও যদি মাসিক এর মতো রক্তপাত হয়।
  • যৌনসংস্রব এর পর পরই যদি অস্বস্তি ও রক্তপাত হয়।
  • যোনি থেকে দূর্গন্ধযুক্ত স্রাব কখনও বা রক্তযুক্ত।
  • পেলভিক অঞ্চলে যন্ত্রনা অর্থাৎ মেরুদন্ডের নীচ ও নিতম্বের মধ্যকার অস্থিকাঠামো তে যন্ত্রনা অনুভব।

যদিও একথাও সত্যি যে বহু মহিলা ম্যালিগন্যান্সির খুব খারাপ অবস্থায় পৌঁছোনোর আগে অবধি উপরিউক্ত কোনো লক্ষণ এর কোনো আভাষ পান না। আবার এই একই লক্ষণসমূহ অন্য অনেকরকম মেয়েলি অসুখের ও উপসর্গ, তাই ঘাতক রোগটি অনেকসময়ই শরীরের ভিতর ঘাঁটি তৈরী করে ফেলে কিছু বোঝার আগেই।

সাবধানতামূলক পরীক্ষা বা টেস্ট যা নিয়মিত করালে আপনাকে সারভিক্যাল ক্যানসারের আক্রমণের বিষয়ে ওয়াকিবহাল রাখবে

যেহেতু জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রবণতা মেয়েদের ক্ষেত্রে খুব বেশি তাই প্রতিটি মহিলারই অসুখটির গতিবিধি বোঝার জন্য কিছু পরীক্ষা মাঝে মাঝেই করা দরকার, এবং এই পরীক্ষাগুলি নিয়মিত ব্যবধানে করলে শরীরে কোনোরকম প্রাথমিক পরিবর্তনও ধরা যায় ফলস্বরূপ রোগটিকে অনেকাংশে প্রথমের দিকেই আটকে দেওয়া যায়। প্রতিটি মহিলা যাদের বয়স ২১ এর বেশি এবং যাঁরা নিয়মিত যৌন সংসর্গ করেন তাঁদের প্রতি তিনবছরে একবার অন্তত পরীক্ষা করা দরকার রোগটির নির্মূলকরণে অথবা প্রাথমিক সনাক্তকরণে। Pap Test ও HPV DNA test. এই দুটি পরীক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান অসুখটির বিষয়ে ওয়াকিবহাল থাকার জন্য।

Pap Test এ করতে গেলে প্যাথোলজিস্ট রোগীর জরায়ুমুখ বা Cervix এর কোষের একটা পাতলা প্রলেপ চেঁছে তুলে নেন জীবকোষ গুলি পরীক্ষা করার জন্য যাকে চিকিৎসাবিদ্যার পরিভাষায় বলে cytological examination. এটি কোষসমূহের চরিত্র বুঝতে সাহায্য করে। যদি প্রাথমিক পরীক্ষায় ডাক্তারবাবু কোনোরকম অস্বাভাবিকতা সনাক্ত করেন তবে তিনি অন্যান্য পরীক্ষা করতে দেন রোগটি নিশ্চিত করতে।

HPV DNA টেষ্ট এর ক্ষেত্রে সারভিক্যাল কোষগুলি পরীক্ষা করা হয় HPV সংক্রমণ ঘটেছে কিনা জানার জন্য।

https://biotechworldindia.in/nri-scientist-co-founded-a-pan-india-health-tech-startup-neucrad-health-hub-india/

সারভিক্যাল ক্যানসারের বিভিন্ন অবস্থা বা স্টেজ (Stage)

ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা সাধারণত জরায়ুমুখ ক্যানসারের গতিবিধি বুঝতে ৪ টি ধাপের একটি শৃঙ্খলাপদ্ধতি অবলম্বন করেন।

স্টেজ ০ – প্রিক্যানসারাস সেল বা এমন কিছু কোষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যেগুলি মারাত্বক নয় অর্থাৎ ম্যালিগন্যান্ট নয় কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক ভাবে চিকিৎসা না হলে ক্যানসার ঘটাতে পারে ভবিষতে।

স্টেজ ১– জরায়ুমুখের ভিতরের কলাকোষ গুলিতে ম্যালিগন্যান্ট কোষের উপস্থিতি।

স্টেজ ২– এর ফলে ক্যানসারটি জরায়ুর অন্যান্য অংশে এমনকি আশেপাশের lymph nodes বা লসিকাগ্রন্থি গুলোতেও ছড়িয়ে যেতে পারে।

স্টেজ ৩– এইক্ষেত্রে ক্যানসারের কোষগুলি যোনিদ্বার এর নীচের অংশে ও পেলভিক ওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এগুলির পাশের lymphnode গুলিতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। Lymph nodes হলো সেই অংশ যেখানে আমাদের দেহের রক্ষাকারী কোষগুলি বা শ্বেতকণিকা আশ্রিত থাকে।   

স্টেজ ৪ এই স্টেজ এ সারভিক্যাল ক্যানসার মুত্রথলি ও মালদ্বারকেও আক্রমণ করে এবং কখনও কখনও অন্যান্য তন্ত্র যেমন লিভার, ফুসফুস এমনকি হাড়েও ছড়িয়ে পরে।

কিভাবে আটকানো যাবে সারভিক্যাল ক্যানসারকে?

জরায়ুমুখ ক্যানসারকে প্রতিরোধ করার জন্য কিছু প্রচলিত পদ্ধটি নিয়ে আলোচনা করা হল।

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ভ্যাকসিন (Human Papillomavirus (HPV) Vaccine)

সারভিক্যাল ক্যানসার ও হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসটির মধ্যে এক জোরদার সম্পর্ক যে আছে সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত। যেহেতু HPV টীকা এই ধরনের ক্যানসারকে প্রতিরোধ করে তাই ডাক্তাররা নিশ্চিত যদি প্রতিটি মহিলাই এই ভ্যাকসিনের আওতায় আসে তবে জরায়ুমুখ ক্যানসারের ঘটনা বেশ অনেকটাই কমে আসবে।

সারভিক্যাল ক্যানসারের নিয়মিত পরীক্ষা করানো

পূর্ণবয়স্ক প্রতিটি মহিলা যদি নিয়মিতভাবে সারভিক্যাল ক্যানসারের কোনোরকম নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে কিনা তা পরীক্ষা করেন তবে জরায়ুমুখের সামান্যতম পরিবর্তন ও প্রথমেই বুঝতে পারবেন এবং সাথে সাথে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবলম্বন করে জরায়ুর সংক্রমনটিকে ক্যানসারে রূপান্তরিত হওয়া থেকে আটকাতে পারবেন।

নির্দিষ্ট যৌনসঙ্গী ও নিরাপদ যৌনতা

যে সমস্ত মহিলারা নির্দিষ্ট যৌনসঙ্গী নির্বাচন করে নিরাপদ যৌনজীবন যাপন করেন তাদের মধ্যে সারভিক্যাল ক্যানসারের রিস্ক অনেকটাই কম থাকে। আবার দেখা গেছে কমবয়সের যৌনতা বা অল্পবয়সে বিয়ের মতো ঘটনা জরায়ুমুখ ক্যানসারের প্রবণতা অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।

নিরাপদ পদ্ধতিগুলি মেনে মেয়েরা এই ভয়ঙ্কর ঘাতক রোগ থেকে নিজেকে বাঁচান, পরিবারের অন্য মহিলাদেরও সচেতন করে তুলুন দীর্ঘজীবনের স্বার্থে।