ভারতে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে ইমিউনিটিকে এড়িয়ে চলা ডাবল মিউট্যান্ট করোনা ভ্যারিইয়েন্ট

Reading Time: 3 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, জুন ৫, ২০২১

কোভিড-১৯ প্যান্ডেমিকের প্রথম ঢেউ বিশ্বের মানুষ অক্লান্ত পরিশ্রমে সামলেছে। তার রেশ যেতে না যেতেই আছড়ে পড়েছে প্যান্ডেমিকের ভয়াবহ দ্বিতীয় ঢেউ। এই পরিস্থিতিতে অনেক বেশী সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, মারাও যাচ্ছেন বহু কোভিড-১৯ রোগী। গবেষণায় ধরা পড়েছে, রোগীর শরীরের ইমিউনিটিকে এড়িয়ে চলতে পারে এমন ভ্যারিইয়েন্ট ভাইরাসের দেখা মিলেছে ভারতে। চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই বিশেষ করোনা ভ্যারিইয়েন্ট ভাইরাসের সংক্রমণের ফলেই দ্বিতীয় পর্যায়ের করোনা সংক্রমণ এতোটা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। 

প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, SARS-CoV-2 অত্যন্ত ধীরগতিতে মিউটেশান বা পরিব্যাপ্তি ঘটায়। কিন্তু, বর্তমান পরিস্থিতি অন্য কথা বলছে। সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে নভেল করোনাভাইরাসের অনেকগুলি মিউট্যান্ট ভ্যারিইয়েন্ট, যারা সহজেই তাদের জিনোম সিকোয়েন্সে বদল ঘটিয়ে ফেলছে। যার ফলে তৈরি হচ্ছে নানা করোনা ভ্যারিইয়েন্ট ও লিনিয়েজ।

  • কিছুদিন আগেই ভারতের মহারাষ্ট্রে করোনারোগীর নমুনা থেকে B.1.617 নামের এক ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিইয়েন্ট আবিষ্কার করা হয়। যাতে “E484Q” এবং “L245R” দুটি মিউটেশান আছে। কিন্তু, বিজ্ঞানীদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এর জন্যে দায়ী হোল B.1.618 নামের আর এক মিউট্যান্ট ভ্যারিইয়েন্ট। 

  • বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের করোনা প্যান্ডেমিক ঘটানোর জন্যে সবচেয়ে বেশী দায়ী B.1.618, প্রায় ৬২.৫% সংক্রমণ এর জন্যে ঘটছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে B.1.618 সংক্রমণের প্রভাব বেশ তীব্র। এর সাথে যুক্ত অন্যান্য লিনিয়েজ ভাইরাসগুলি আমেরিকা, সুইটযারল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরে পাওয়া গেছে। 

  • B.1.618 মিউট্যান্ট ভ্যারিইয়েন্ট B.1.617 এর থেকে কিছুটা আলাদা। B.1.618 ভাইরাসে পাওয়া যায় বিভিন্ন কম্বিনেশানের কিছু বিশেষ মিউটেশান। যেমন, নভেল করোনাভাইরাস স্পাইক প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিড সিকোয়েন্সের ১৪৫ ও ১৪৬ স্থানের টাইরোসিন এবং হিসটিডিন অ্যামিনো অ্যাসিড বাদ পড়ে বা ‘ডিলিশান মিউটেশান’ হবার ফলে এই B.1.618 মিউট্যান্ট ভ্যারিইয়েন্ট তৈরি হয়েছে। 

  • এছাড়াও, এতে ‘E484K’ এবং ‘D614G’ মিউটেশান দেখা যায় যা যথাক্রমে ইমিউন এস্কেপ আর বেশী মাত্রায় সংক্রমণ ছড়ানোর জন্যে দায়ী। ‘E484K’ মিউটেশনের কারনে করোনা রোগীর দেহে প্লাসমা থেরাপি কাজ করে না।    
“একজন গবেষক বিজ্ঞানী হয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিজ্ঞান, গবেষণা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে আসতে বদ্ধপরিকর – আপনার স্বাস্থ্য সচেতনতা আপনাকে বিপদের সময় পথ দেখাবে” – বিশ্বরূপ ঘোষ, নিউক্র্যাড হেলথ ফাউন্ডার । আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি গবেষক বিজ্ঞানী বিশ্বরূপ ঘোষ তার স্টার্ট আপ নিয়ে আসছেন বাংলা তথা ইন্ডিয়াতে। খুব শীঘ্র নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর ডিজিটাল ডাক্তার প্লাটফর্ম শুরু হবে।

B.1.617 এবং B.1.618 মিউট্যান্ট ভাইরাস লিনিয়েজ রোগীদের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিং করে পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, B.1.618 ভীষণভাবে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে এবং এই ভ্যারিইয়েন্ট সর্বাধিক কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর জন্যে দায়ী বলে বিজ্ঞানীদের অনুমান। তবে, সঠিকভাবে এই মুহূর্তে কিছু বলা যাবে না, কারন- এই ভ্যারিইয়েন্ট ভাইরাস পুনঃসংক্রমণ ঘটায় কিনা জানা নেই, ভাইরাসটির সংক্রমণ প্রকৃতি ও দেহকোষে সংক্রমণ কৌশলও অজানা। এছাড়া, এই  ভ্যারিইয়েন্টের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন ঠিক কতোটা কার্যকরী তারও সঠিক পরিসংখ্যান  এখনো পাওয়া যায় নি। সমস্যা হচ্ছে, সংক্রমণ যে গতিতে ছড়াচ্ছে, সেই অনুপাতে টীকাকরন দেশের সর্বত্র এখনো শুরু হয় নি। টীকাকরন শুরু হবার পরে, শরীরে করোনা প্রতিরোধক্ষমতা কতোটা তৈরি হবে তার উপরেও এই ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভ্যারিইয়েন্টের সংক্রমণ তীব্রতা নির্ভর করবে। 

বর্তমানে করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ চলছে, কিন্তু, ভারত সহ বিশ্বের নানা স্থানে আসতে পারে তৃতীয় ও পরবর্তী ঢেউ, এই কথার গুরুত্ব সব সময়ে মনে রাখতে হবে। কিছু বিষয়ে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেমন, 

১) যে কোন মুল্যে জন সমাবেশ ও জমায়েতে ভিড় করা যাবে না।

২) চিকিৎসক ও বিজ্ঞানীদের অবিলম্বে ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভ্যারিইয়েন্টের উপর গবেষণা করে ভাইরাস মিউটেশানের প্রকৃতি ও তার সংক্রমণ ক্ষমতার তথ্য বার করতে হবে।

৩) যে ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে, তা এই নতুন ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভ্যারিইয়েন্টের সংক্রমণ প্রতিরোধে সত্যিই কার্যকরী কিনা তা গবেষণা করে দেখতে হবে। 

৪) নতুন ‘ডাবল মিউট্যান্ট’ ভ্যারিইয়েন্টগুলি কি পদ্ধতিতে ইমিউন সিস্টেমকে এড়িয়ে চলে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে সেই সংক্রমণ কৌশল জানা অতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, এই পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন কখনোই ১০০% কাজ করবে না। ফলে জনগোষ্ঠীতে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হবার ঘটনাটিও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।  

৫) ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR) এর এপিডেমিওলজি অ্যান্ড কমিউনিকেবল ডিসিস প্রধান জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতিতে সেই মাস্ক ব্যাবহার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও স্যানিটাইজার ব্যাবহার এবং সেই সাথে কঠিন ভাবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারগুলি নিয়মানুযায়ী পালন করে চলতে হবে। একই সাথে স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়ন যেমন- আরও বেশী কোভিড-১৯ হাসপাতাল, আইসোলেশান সেন্টার, বেড, অক্সিজেন সাপ্লাই, ভেন্টিলেটর, অক্সিজেন কন্সেট্রেটর, জীবনদায়ী ওষুধের দ্রুত সরবরাহ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আরও জোর দিতে হবে। তবেই এই সংক্রমণ পরিস্থিতির সামাল দেওয়া সম্ভব।

        স্বাস্থ্যের নির্ভরযোগ্য একমাত্র বাংলা YouTube চ্যানেল – সাবস্ক্রাইব করুন।

তথ্যসূত্রঃ

  1. Di Caro A, Cunha F, Petrosillo N, et al. Severe acute respiratory syndrome coronavirus 2 escape mutants and protective immunity from natural infections or immunizations [published online ahead of print, 2021 Mar 29]. Clin Microbiol Infect. 2021;S1198-743X(21)00146-4. doi:10.1016/j.cmi.2021.03.011
  2. Garcia-Beltran WF, Lam EC, St Denis K, et al. Circulating SARS-CoV-2 variants escape neutralization by vaccine-induced humoral immunity. Preprint. medRxiv. 2021;2021.02.14.21251704. Published 2021 Feb 18. doi:10.1101/2021.02.14.21251704
  3. Fontanet A, Autran B, Lina B, Kieny MP, Karim SSA, Sridhar D. SARS-CoV-2 variants and ending the COVID-19 pandemic. Lancet. 2021 Mar 13;397(10278):952-954. doi: 10.1016/S0140-6736(21)00370-6. Epub 2021 Feb 11. PMID: 33581803; PMCID: PMC7906631.

Write your comments

You may have missed

%d bloggers like this: