নভেল করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণে এবার আসছে ফেলুদা!

Reading Time: 4 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, অক্টোবর ৫, ২০২০

অপরাধী শনাক্তকরণে ফেলুদার জুড়ি মেলা ভার, কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাসকে পাকড়া্তে এই প্যান্ডেমিকে আসতে চলেছেন ফেলুদা। তবে, এই ফেলুদা আমাদের সোনার কেল্লার ফেলুদা নন, ইনি হলেন “FNCAS9-এডিটর-লিমিটেড ইউনিফর্ম ডিটেকশন অ্যাসে” যার সংক্ষিপ্ত নাম হল ফেলুদা (FELUDA)। নিউ দিল্লির কাউন্সিল অফ সাইন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR) পরিচালিত ইনস্টিটিউট অফ জিনোমিক্স অ্যাণ্ড ইন্টিগ্রেতটিভ বায়োলজি (IGIB) এবং টাটা সন্স কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে আসতে চলেছে এই ফেলুদা।  কোভিদ-১৯  আক্রান্ত রোগীর শরীরে নভেল করোনাভাইরাসকে শনাক্তকরণ করতে সাহায্য করবে এই অত্যাধুনিক পদ্ধতি। এই ব্যবস্থায় অত্যন্ত কম সময়ে এবং কম খরচে ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

কিভাবে কাজ করে এই ফেলুদা?

IGIB ডিরেক্টর ডঃ অনুরাগ আগারওয়াল জানিয়েছেন ফেলুদা পদ্ধতিটি তৈরি করতে তাঁর গবেষকরা ব্যবহার করেছেন অত্যাধুনিক ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ (CRISPR-CAS-9) জিন এডিটিং টেকনোলজি এবং পেপার-স্ট্রিপ কেমিস্ট্রি। এই দুই বিশেষ পদ্ধতির সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে ফেলুদা, যার সাহায্যে করোনা রোগীর রক্ত, লালারস এবং ন্যাসাল সোয়াব থেকে প্রাপ্ত নমুনায় SARS-CoV-2 ভাইরাসের সিকোয়েন্স খুব সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব।  তবে এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণে যাবার আগে আমাদের জেনে নেয়া উচিত ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ পদ্ধতি সম্পর্কে। 

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ ,
এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে। নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর এন্ট্রেপ্রেনিউরশিপ প্রোগ্রাম এ কোনো পুঁজি না লাগিয়ে অংশ গ্রহণ করতে অথবা জানতে হোয়াট’স আপ করুন +19175663401

ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস৯ জিন এডিটিং টেকনোলজিঃ 

জাপানের ওসাকা ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়ওসিযুমি ইসিনো ১৯৮৭ সালে এই ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ জিন এডিটিং টেকনোলজির আবিষ্কারক। আসলে, প্রোক্যারিওটিক কোষে ভাইরাস সংক্রমণকে প্রতিহত করতে এই ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ সিস্টেম লক্ষ্য করা যায়। ব্যাকটেরিয়া কোষে কোন ভাইরাস সংক্রমিত হলে সেই ভাইরাসের জিনোমটি ব্যাকটেরিয়া কোষের মধ্যে প্রবেশ করে। ব্যাকটেরিয়ার জিনোমে থাকে কিছু ছোট ছোট ডিএনএর রিপিট সিকোয়েন্স যাদের একত্রে বলে “ক্রিস্পার অ্যারে” এবং সেই সিকোয়েন্সের সাথে থাকে “স্পেসার  সিকোয়েন্স”। ব্যাকটেরিয়া কোষে অবস্থিত ক্যাস্পেস-১ এবং ক্যাস্পেস-২ এর দ্বারা ভাইরাসের জিনোমে অবস্থিত স্পেসার  সিকোয়েন্স কেটে গিয়ে ব্যাকটেরিয়ার ক্রিস্পার অ্যারে সিকোয়েন্সের সাথে এটি জুড়ে যায়। এরপরে, যখন ট্রানস্ক্রিপশন হয় তখন তার থেকে ছোট ক্রিস্পার আরএনএ অনু তৈরি হয়। পরবর্তীকালে, পুনরায় ভাইরাস সংক্রমণ দেখা দিলে, ক্রিস্পার আরএনএ এবং ব্যাকটেরিয়ার কোষে থাকা অনাক্রমক উৎসেচক (Immunity Enzyme) ক্যাস্পেস-৯ বা ক্রিস্পার অ্যাসোসিয়েটেড-৯ এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে তৈরি হয় এক আণবিক যৌগ যেটি ভাইরাসের জিনোমে অবস্থিত বিশেষ প্যাম ( Protospacer adjacent motif) সিকোয়েন্সকে চিনতে পারে। এই আনবিক যৌগটি ভাইরাস জিনোম কে বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়।   

বস্তুত এই এই ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ জিন এডিটিং টেকনোলজির সাহায্যে কোন ডিএনএ সিকোয়েন্স কে সহজেই কেটে বার করে ফেলা যায়, অন্য কোন নতুন সিকোয়েন্স সেই জায়গায় যোগ করা যায্‌ অথবা সিকোয়েন্সটির পরিবর্তন করা যায়, অর্থাৎ “জিন এডিটিং” করা সম্ভব হয়। 

কোভিড-১৯ নমুনা শনাক্তকরনে ফেলুদার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ

এই যুগান্তকারী আণবিক কৌশলটি আবিষ্কৃত হওয়ার পরে পরবর্তীকালে মেডিকেল বায়োটেকনোলজির বিভিন্ন শাখায় এর বহুল ব্যবহার দেখা যায়। বর্তমান ফেলুদা পদ্ধতি এই একই আণবিক কৌশলকে অনুসরণ করে।  এই ক্ষেত্রে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর রক্তের নমুনা থেকে প্রথমে আরএনএ নিষ্কাশিত করা হয়। পরবর্তী ধাপে, সেই আরএনএ  ব্যবহার করে রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন পিসিআর (RT-PCR) করা হয় যার ফলে তৈরি হয় সি-ডিএনএ। এরপর সেই ডিএনএ নিয়ে ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষার জন্য স্যাম্পেল তৈরি করা হয় এবং যে কেমিক্যাল স্ট্রিপে ক্রিস্পার-ক্যাস্পেস-৯ সিস্টেমটি যুক্ত আছে, তাতে যোগ করা হয়। 

সমগ্র বিক্রিয়াটি শেষ হলে “কালারিম্যাট্রিক  রিঅ্যাকশন” এর মাধ্যমে সহজেই জানা যায় যে নমুনায় ভাইরাস আছে কিনা। এর জন্য সময় লাগে মাত্র এক ঘণ্টা। বিশেষ উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, নমুনা পরীক্ষার কাজটি বিশেষ কোন যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই যে কোন সাধারন ল্যাবরেটরী সেটিং-এ করা যেতে পারে।  

ফেলুদা পদ্ধতিতে ভাইরাস সনাক্ত করণের কাজটি অত্যন্ত সুলভে করা যায়। যেখানে সাধারণভাবে আর-টি পিসিআর (RT-PCR) ব্যবহার করে খরচ হয় ৪৫০০ টাকা সেখানে মাত্র ৫০০ টাকায় ফেলুদা করা যেতে পারে। এর ব্যবহারবিধি অত্যন্ত সহজ হওয়ায় জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সবার কাছে সহজেই এই পদ্ধতি পৌঁছে যেতে পারে। ফেলুদা কিটের রক্ষণাবেক্ষণ বেশ সহজ এবং  পরীক্ষার পরে ফলাফল বিশ্লেষণ করতে কোন যন্ত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্রেগ্ন্যান্সি কিটের মতো খালি চোখেই এটি বোঝা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ফেলুদা পদ্ধতি ডিএনএ বা আরএনএতে কোন একক মিউটেশন (Single Mutation) থাকলে বা রোগজনক মিউটেশন (Pathogenic Mutation) থাকলেও ব্যবহার করা যেতে পারে অর্থাৎ ভাইরাস শনাক্তকরণ এটি একটি সার্বজনীন পদ্ধতি (Universal Method)। 

গবেষক ও চিকিৎসক মহলে ইতিমধ্যেই সাড়া ফেলে দিয়েছে এই ফেলুদা পদ্ধতি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই পদ্ধতিতে সহজেই সাধারন হেলথকেয়ার ট্রেনিং নিয়েই যে কেউ নমুনা পরীক্ষা করতে পারে। বৈজ্ঞানিকদের আশা, এই পদ্ধতিতে নিকট ভবিষ্যতে শুধুমাত্র নভেল করোনাভাইরাস নয় অন্যান্য সংক্রামক ভাইরাস সনাক্তকরণে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে এই ফেলুদা পদ্ধতি। 

বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন neucradhealth@gmail.com

তথ্যসূত্রঃ

  1. Paul D, Naik P, Roy S. Developing a Point-of-Care Molecular Test to Detect SARS-CoV-2 [published online ahead of print, 2020 Jun 19]. Transactions of the Indian National Academy of Engineering. 2020;1-4. doi:10.1007/s41403-020-00127-5
  2. https://www.tata.com/newsroom/covid19/covid-19-feluda-testing-digital-solutions-tata-sons
  3. Weissleder R, Lee H, Ko J, Pittet MJ. COVID-19 diagnostics in context. Sci Transl Med. 2020 Jun 3;12(546):eabc1931. doi: 10.1126/scitranslmed.abc1931. PMID: 32493791.
  4. Zhao X, Markensohn JF, Wollensak DA, Laterza OF. Testing For SARS-CoV-2: The Day the World Turned its Attention to the Clinical Laboratory. Clin Transl Sci. 2020 Sep;13(5):871-876. doi: 10.1111/cts.12828. Epub 2020 Jun 29. PMID: 32475012; PMCID: PMC7300945.
  5. Guglielmi G. The explosion of new coronavirus tests that could help to end the pandemic. Nature. 2020 Jul;583(7817):506-509. doi: 10.1038/d41586-020-02140-8. PMID: 32681157.
  6. Dara M, Talebzadeh M. CRISPR/Cas as a Potential Diagnosis Technique for COVID-19. Avicenna J Med Biotechnol. 2020;12(3):201-202.
  7. Xiang X, Qian K, Zhang Z, et al. CRISPR-cas systems based molecular diagnostic tool for infectious diseases and emerging 2019 novel coronavirus (COVID-19) pneumonia. J Drug Target. 2020;28(7-8):727-731. doi:10.1080/1061186X.2020.1769637
  8. Hou T, Zeng W, Yang M, Chen W, Ren L, Ai J, Wu J, Liao Y, Gou X, Li Y, Wang X, Su H, Gu B, Wang J, Xu T. Development and evaluation of a rapid CRISPR-based diagnostic for COVID-19. PLoS Pathog. 2020 Aug 27;16(8):e1008705. doi: 10.1371/journal.ppat.1008705. PMID: 32853291; PMCID: PMC7451577.
  9. Strich JR, Chertow DS. CRISPR-Cas Biology and Its Application to Infectious Diseases. J Clin Microbiol. 2019 Mar 28;57(4):e01307-18. doi: 10.1128/JCM.01307-18. PMID: 30429256; PMCID: PMC6440769.

Write your comments

%d bloggers like this: