কৃত্রিম হৃদপিণ্ড ব্যাবহারের অনুমোদন দিলো ইউরোপিয়ান কমিশন

Reading Time: 3 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, জানুয়ারী ৩১, ২০২১

বর্তমানে, বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ২৬০ লক্ষ মানুষ হার্ট ফেলিওরের শিকার এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৫% মানুষের অসুস্থতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অত্যাধুনিক চিকিৎসার সাহায্যেও তাদের সারিয়ে তোলা সম্ভব হছে না। সাধারনত, হার্ট ফেলিওর ধরা পড়ার পর অর্ধেকেরও কম মানুষ পাঁচ বছর বেঁচে থাকেন। সেক্ষেত্রে হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন হ’ল একমাত্র উপায়। কিন্তু, পদ্ধতিটি যথেষ্ট ব্যয়সাপেক্ষ এবং সঠিক সময়ে হৃদপিণ্ড দাতাদের তীব্র অভাব প্রতি বছর হৃদপিণ্ড প্রতিস্থাপনের কাজটিকে ভীষণ সমস্যার সম্মুখীন করে। সেই সমস্যাকে দূর করতে, ফ্রান্সের কারম্যাট কোম্পানি তৈরি করেছে পৃথিবীর সর্বাধুনিক কৃত্রিম হৃদপিণ্ড বা ‘টোটাল আর্টিফিশিয়াল হার্ট’ (TAH)। ইতিমধ্যেই, ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের প্রয়োজনীয় অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। কারম্যাট তাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত অনুমোদনের পরে এই বছরের শেষে কৃত্রিম হৃদপিণ্ড বিক্রয়ের কাজ শুরু করবে।

বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং সার্জেন অ্যালেইন কারপেন্টিয়ার প্রথম কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের কথা ১৯৯৩ সালে উপস্থাপন করেন। সেই সময়, ফ্রান্সের শিল্পপতি জিয়ান-লাক লাগাডেরে এই পরিকল্পনার কথা শুনে বিভিন্ন ল্যাবে কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের গবেষণা শুরু করেন। লাগাডেরে কারম্যাট কোম্পানির মুখ্য শেয়ার হোল্ডার হবার জন্যে, কারম্যাট এই গবেষণায় প্রধান ভূমিকা গ্রহন করে। গবেষণা শুরুর প্রায় দশ বছর পরে কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের প্রোজেক্ট শেষ হয়। 

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ ,
এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে। নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর এন্ট্রেপ্রেনিউরশিপ প্রোগ্রাম এ কোনো পুঁজি না লাগিয়ে অংশ গ্রহণ করতে অথবা জানতে হোয়াট’স আপ করুন +917001105893

কিভাবে কাজ করে এই কৃত্রিম হৃদপিণ্ড?

প্রধানত, হার্ট ফেলিওরের পরে সার্জারির সময় পর্যন্ত হৃদপিণ্ডের সাপোটিং সিস্টেম  হিসাবে প্রয়োজন হয় কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের। সেক্ষেত্রে, প্রতিস্থাপনযোগ্য  উপাদান দিয়ে তৈরি বায়োপ্রস্টেস্টিক ‘টোটাল আর্টিফিশিয়াল হার্ট’ রোগীদের ক্ষেত্রে জীবনদায়ী ভূমিকা নেয়। বস্তুত, যন্ত্রটি সাধারন হৃদপিণ্ডের তুলনায় বড়। এতে দুটি কৃত্রিম নিলয় এবং চারটি হার্ট ভাল্ভ আছে। এগুলি আসলে ‘ফ্রীডম ড্রাইভার’ বলে একটি এয়ার পাম্পের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। প্রায় ৮৫-৯০ ভাগ রোগীর বাম দিকের নিলয় বা ভেনট্রিক্যাল আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে যারা সঙ্কটজনক অবস্থার সম্মুখীন হন, তাদের আকারে ছোট একটি যন্ত্রের সাহায্য নিতে হয়, যার নাম ‘লেফট ভেনট্রিকিউলার অ্যাসিস্ট ডিভাইস (LVAD)’। কিন্তু, যাদের দুটি  ভেনট্রিক্যালই আক্রান্ত হয়ে কাজ করা বন্ধ করে দেয় (একে বাই-ভেনট্রিকিউলার ফেলিওর বলে) তাদের টোটাল আর্টিফিশিয়াল হার্টের সাহায্য নেওয়া ছাড়া দ্বিতীয় কোন পথ নেই। 

টোটাল আর্টিফিশিয়াল হার্টের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যঃ

  • কৃত্রিম হৃদপিণ্ড বসাতে গেলে সবসময়েই সার্জারির প্রয়োজন হয়। সাধারন হার্ট সার্জারির থেকে এটি অত্যন্ত জটিল। এই  অপরেশানের পর সম্পূর্ণ সুস্থ হতে অনেক সময় লাগে। 
  • সাধারন হৃদপিণ্ডের তুলনায় কৃত্রিম হৃদপিণ্ড আকারে বড় হওয়ায়, প্রথমেই সিটি স্ক্যান করে দেখে নিতে হয় বক্ষ পিঞ্জরে এই যন্ত্র বসানোর মতো যথেষ্ট জায়গা আছে কিনা। তবে, বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে তা ঠিকভাবে বসে যায়। 
  • যন্ত্রটি ব্যাটারিতে চলে, ফলে রোগী স্বাভাবিক ভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন। প্রয়জনে ব্যাটারিতে চার্জ দেওয়া যায়। 
  •  যন্ত্রের দুটি অংশ শরীরের বাইরে বার হয়ে থাকে, ফলে সেগুলি কিছুটা যন্ত্রণাদায়ক হয়। 
  •  সবচেয়ে সমস্যা হোল জীবাণু সংক্রমণ। যন্ত্রের বিভিন্ন অংশের সাথে শরীরের অভ্যন্তরে ও বাইরে জীবাণু প্রবেশ করতে পারে। যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন না করলে, সংক্রমণ বাড়তে থাকে। এছাড়া, শরীরে যন্ত্র থাকাকালীন বিভিন্ন রক্তবাহে রক্তপিণ্ড তৈরি হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে, চিকিৎসকরা অ্যান্টিকোয়াগুলেন্ট বা ‘ব্লাড থিনার’ ব্যাবহার করেন। তবে, রোগীর অত্যাধিক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
  • এই কৃত্রিম হৃদপিণ্ড সাময়িক ভাবে (১৮০ দিনের জন্যে) শরীরে বসানো যায়। দীর্ঘদিনের জন্যে এই যন্ত্রকে বসানোর উপযোগী করে তোলার গবেষণা চলছে। 
  • এই যন্ত্র সাধারন ভাবে, ৭০ কিউবিক সেন্টিমিটার রক্ত পাম্প করে থাকে। কিন্তু, শিশু, খর্বাকৃতি রোগী ও মহিলাদের ক্ষেত্রে রক্ত বেশ কিছুটা কম লাগে। সেই বিষয়ে গবেষনা করা হচ্ছে। 

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কারম্যাটের সাথে সিনকার্ডিয়া সিস্টেমস এবং অ্যাবিওমেড, উভয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা এই একই বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছে। কারম্যাটের তরফ থেকে বলা হয়েছে, যন্ত্রটির প্রতি ইউনিটের দাম প্রাথমিক ভাবে দেড় হাজার ইউরো হতে পারে। আশা করা যায়, এই কৃত্রিম হৃদপিণ্ডের উপযুক্ত ব্যাবহার হার্ট ফেলিওরে মানুষের মৃত্যুর হারকে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।   

তথ্য সুত্রঃ 

  1. Mohacsi P, Leprince P. The CARMAT total artificial heart. Eur J Cardiothorac Surg. 2014 Dec;46(6):933-4. doi: 10.1093/ejcts/ezu333. Epub 2014 Sep 15. PMID: 25228743.
  2. Jauhar S. The artificial heart. N Engl J Med. 2004 Feb 5;350(6):542-4. doi: 10.1056/NEJMp038244. PMID: 14762180.
  3. Cooley DA. The total artificial heart. Nat Med. 2003 Jan;9(1):108-11. doi: 10.1038/nm0103-108. PMID: 12514722.
  4. Gray NA Jr, Selzman CH. Current status of the total artificial heart. Am Heart J. 2006 Jul;152(1):4-10. doi: 10.1016/j.ahj.2005.10.024. PMID: 16824826.
  5. Smadja DM, Susen S, Rauch A, Cholley B, Latrémouille C, Duveau D, Zilberstein L, Méléard D, Boughenou MF, Belle EV, Gaussem P, Capel A, Jansen P, Carpentier A. The Carmat Bioprosthetic Total Artificial Heart Is Associated With Early Hemostatic Recovery and no Acquired von Willebrand Syndrome in Calves. J Cardiothorac Vasc Anesth. 2017 Oct;31(5):1595-1602. doi: 10.1053/j.jvca.2017.02.184. Epub 2017 Mar 1. PMID: 28648774.

Write your comments

%d bloggers like this: