কিডনির সমস্যা ও তার চিকিৎসাঃ একটি প্রাসঙ্গিক আলোচনা

Reading Time: 5 minutes

শুভময় ব্যানার্জী, পিএইচডি, নিউক্র্যাড হেলথ এর প্রতিবেদন, মার্চ ১৩, ২০২১

বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ১০% মানুষ বর্তমানে কিডনির সমস্যায় ভুগছেন এবং প্রতি বছর লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটছে সময় মতো সঠিক চিকিৎসার অভাবে। সুতরাং, কিডনির সমস্যাকে অবহেলা নয় বরং কিডনির রোগ উপসর্গগুলিকে ঠিকভাবে চিহ্নিত করে যথা সময়ে যথোপযুক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন। 

মানবদেহের মেরুদণ্ডের প্রতিটি পাশে একটি করে কিডনি রয়েছে। যদিও, একটিমাত্র কিডনির সাহায্যেই দেহের রেচনক্রিয়ার কাজ সম্পন্ন হতে পারে, কিন্তু মানুষ দ্বি-পার্শ্বীয় প্রতিসম প্রাণী হবার জন্যে এবং বিবর্তনে কিডনির অসামান্য গুরুত্ব থাকায় মানবশরীরে এর সংখ্যা দুই। দেহের সুস্থতা বজায় রাখার জন্যে কিডনি অপরিহার্য অঙ্গ। কিডনি মূলত রক্তে বাহিত নাইট্রোজেন যুক্ত রেচন পদার্থ, অতিরিক্ত জল এবং অন্যান্য বিপাকজাত দূষিত পদার্থগুলিকে ছেঁকে শরীর থেকে মূত্রের মাধ্যমে বার করে দেয়। কিডনি শরীরের অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা করে, সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম লবণের মাত্রাও নিয়ন্ত্রণ করে। কিডনি বিশেষ হরমোন তৈরি করে যা রক্তচাপ এবং লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। এমনকি, কিডনি ভিটামিন ডি-কে সক্রিয় করে তোলে যা শরীরকে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমান হয়েছে যে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগসংক্রমণে কিডনির ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। কিডনির রোগে হাড় দুর্বল হওয়া, স্নায়ুর ক্ষতি এবং অপুষ্টি সহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিডনির রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করলে কিডনি পুরোপুরি তার কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে। এর অর্থ হ’ল রোগীর শরীরের বাইরে থেকে তখন ডায়ালাইসিসের মাধ্যমে কিডনির কার্য সম্পাদন করতে হবে। ডায়ালাইসিস এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি যা মেশিনের সাহায্যে রক্তকে পরিশোধন করে, পুনরায় রোগীর দেহে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এই কৃত্রিম পদ্ধতি কিডনির রোগ নিরাময় করতে পারে না তবে এটি রোগীর জীবনকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।

কিডনি রোগের প্রকার ও কারণগুলি কি কি?

দীর্ঘস্থায়ী কিডনির রোগ

কিডনি রোগের সবচেয়ে সাধারণ রূপ হলো ক্রনিক কিডনির রোগ। দীর্ঘমেয়াদী এই রোগে সময়ের সাথে রোগীর অবস্থার উন্নতি হয় না। এটি সাধারণত উচ্চ রক্তচাপের কারণে ঘটে। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক কারণ এটি কিডনির গ্লোমেরিউলাসের চাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। গ্লোমেরিউলাস হ’ল কিডনির ক্ষুদ্র রক্তনালীগুলির একটি বিশেষ গঠন যেখানে রক্ত ​​পরিষ্কার হয়। সময়ের সাথে সাথে, বর্ধিত চাপ এই গুরুত্বপূর্ণ গঠনের ক্ষতি করে এবং কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস পেতে শুরু করে।

ডায়াবেটিস ক্রনিক কিডনি রোগের একটি প্রধান কারণ। ডায়াবেটিস এমন একধরণের রোগ যা রক্তে উচ্চ শর্করার কারণ হয়ে থাকে। রক্তে শর্করার বর্ধিত মাত্রা কিডনির গ্লোমেরিউলাসের ক্ষতি করে। এর ফলে কিডনিগুলি রক্ত ​​সঠিকভাবে পরিষ্কার করতে পারে না। কিডনি রক্ত পরিশোধনের কাজে ব্যর্থ হলে শরীরের বিপাকক্রিয়ায় উৎপন্ন টক্সিন শরীরে জমতে থাকে এবং নানা রোগ সৃষ্টি করে।

কিডনিতে পাথর

কিডনিতে পাথর তৈরী হওয়া আর একটি সাধারণ সমস্যা। এগুলি ঘটে যখন রক্তে খনিজ এবং অন্যান্য পদার্থগুলি (মূলতঃ ক্যালসিয়াম অক্সালেট) কিডনিতে স্ফটিক বা ক্রিস্টাল হয়ে শক্ত পাথর গঠন করে। কিডনিতে পাথর সাধারণত প্রস্রাবের সময় শরীর থেকে বেরিয়ে আসে। কিডনির অভ্যন্তরে অবস্থিত টিসু পাথরের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অত্যন্ত ব্যাথা হতে পারে। 

গ্লোমারুলোনফ্রাইটিস

গ্লোমারুলোনফ্রাইটিস হ’ল গ্লোমেরিউলাসের প্রদাহ।  গ্লোমারুলোনফ্রাইটিস সংক্রমণ, ওষুধ বা জন্মগত অস্বাভাবিকতার কারণে ঘটে (জন্মের সময় বা তার খুব পরেই দেখা যায় এমন ব্যাধি)। এটি প্রায়শই নিজের থেকে ভাল হয়ে যায়।

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ

পলিসিস্টিক কিডনি রোগ হ’ল একটি জিনগত ব্যাধি যা কিডনীতে অসংখ্য সিস্ট (তরলের ছোট থলি) তৈরী হওয়ার কারনে হয়। এই সিস্টগুলি কিডনির স্বাভাবিক কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে পৃথক ভাবে কিডনি সিস্ট তৈরী হলে তা সর্বদা ক্ষতিকারক নয়, কিন্তু পলিসিস্টিক কিডনি রোগ আরও গুরুতর পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে।

মূত্রনালীর সংক্রমণ

মূত্রনালীর সংক্রমণ (ইউটিআই) হলো রেচনতন্ত্রের যে কোনও অংশের ব্যাকটিরিয়া সংক্রমণ। মূত্রাশয় এবং মূত্রনালীতে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এগুলি সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে সারানো যায় তবে যদি সময়ে চিকিৎসা না করা হয় তবে এই সংক্রমণগুলি কিডনিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং কিডনির কাজকে ব্যাহত করতে পারে।

নিউক্র্যাড হেলথ নিয়ে আসছে নিউক্র্যাড হেলথ হাব – বাংলায় এক নতুন স্টার্ট আপ ,
এক বাঙালি বিজ্ঞানীর হাত ধরে। নিউক্র্যাড হেলথ হাব এর এন্ট্রেপ্রেনিউরশিপ প্রোগ্রাম এ কোনো পুঁজি না লাগিয়ে অংশ গ্রহণ করতে অথবা জানতে হোয়াট’স আপ করুন +917001105893

কিডনি রোগের লক্ষণগুলি কি কি?

কিডনি রোগে উপসর্গগুলি তীব্র না হয়ে উঠা অবধি বোঝা যায় না।

নিম্নলিখিত উপসর্গগুলি হলো কিডনি রোগের লক্ষণ:

  • ক্লান্তি
  • মনোযোগের অসুবিধা 
  • ঘুমোতে সমস্যা
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া 
  • পেশীর টান টান ভাব 
  • ফোলা পায়ের পাতা /গোড়ালি
  • সকালে চোখের চারপাশে ফোলা ভাব 
  • শুষ্ক, খসখসে ত্বক
  • ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, বিশেষত গভীর রাতে

গুরুতর কিডনি সমস্যার লক্ষণগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • বমি বমি ভাব
  • ক্ষুধামান্দ্য
  • প্রস্রাবের পরিমানের ঘন ঘন পরিবর্তন
  • রক্তাল্পতা
  • যৌন ইচ্ছা হ্রাস পাওয়া 
  • পটাসিয়ামের মাত্রা হঠাৎ বৃদ্ধি (হাইপারক্লেমিয়া)
  • পেরিকার্ডিয়ামের প্রদাহ

কিডনি রোগ নির্ণয় করা হয় কীভাবে?

আপনার চিকিৎসক প্রথমে নির্ধারণ করবেন যে আপনি কোনও উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত কিনা। তারপরে আপনার কিডনিগুলি সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা দেখতে তিনি কিছু পরীক্ষা করতে পারেন।

এই পরীক্ষাগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে: 

গ্লোমেরিউলাসের পরিস্রাবণ হার (জিএফআর)

এই পরীক্ষাটি আপনার কিডনিগুলি কতটা স্বাভাবিক কাজ করছে তা পরিমাপ করবে এবং কিডনি রোগের স্তর নির্ধারণ করবে।

আল্ট্রাসাউন্ড বা কম্পিউটারাইজ্ড টোমোগ্রাফি (সিটি) স্ক্যান

আল্ট্রাসাউন্ড এবং সিটি স্ক্যানগুলি আপনার কিডনি এবং মূত্রনালীর স্পষ্ট চিত্র তৈরি করে। এই পদ্ধতি আপনার কিডনিগুলির আকার-আকৃতি ঠিক আছে কিনা তা  জানিয়ে দেয়। এই পদ্ধতিতে কিডনিতে সৃষ্টি হওয়া কোন টিউমার বা কাঠামোগত সমস্যাও চিহ্নিত করা যেতে পারে।

কিডনি বায়োপসি

এই পদ্ধতিতে আপনার চিকিৎসক আপনার কিডনি থেকে একটি ছোট টিস্যু নিয়ে নেবেন এবং টিস্যুর মধ্যে অবস্থিত কোষগুলির প্রকৃতি কেমন তা কালচার করে জানা যাবে। 

প্রস্রাব পরীক্ষা

আপনার চিকিৎসক মূত্রে অ্যালবুমিন আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য আপনাকে অনুরোধ করতে পারেন। অ্যালবুমিন এমন একটি প্রোটিন যা আপনার কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে আপনার মূত্রের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে।

রক্ত ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা

ক্রিয়েটিনাইন একটি বর্জ্য পদার্থ। ক্রিয়েটাইন (পেশীতে সঞ্চিত একটি অণু) ভেঙে গেলে এটি রক্তে ছড়িয়ে যায়। আপনার কিডনি সঠিকভাবে কাজ না করলে আপনার রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়বে।

কিডনির চিকিৎসায় বিশেষ ড্রাগের ব্যবহার:

চিকিৎসকরা প্রায়শই এনজিওটেনসিন-রূপান্তরকারী এনজাইম (এসিই) ইনহিবিটারগুলি যেমন লিসিনোপ্রিল এবং রামিপ্রিল, বা অ্যাঞ্জিওটেনসিন রিসেপ্টর ব্লকারস (এআরবি), যেমন ইরবেসার্টন এবং ওলমেসার্টন ব্যবহার করতে বলেন। এগুলি হ’ল রক্তচাপের ওষুধ যা কিডনি রোগের অগ্রগতিকে ধীর করতে পারে। রোগীর উচ্চ রক্তচাপ না থাকলেও কিডনির কার্যকারিতা ঠিক রাখার জন্য এই ওষুধগুলি চিকিৎসক দিতে পারেন।

রোগীকে  কোলেস্টেরল ড্রাগ (যেমন সিমভাস্ট্যাটিন) দিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে। এই ওষুধগুলি রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে পারে এবং কিডনির স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারেই চলবেন এবং ঔষধ নেবেন।

কিডনি রোগের চিকিৎসায় জীবনযাত্রার পরিবর্তন:

কিডনির রোগে ডায়েটে পরিবর্তন করা ওষুধ খাওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ কিডনি রোগের অন্তর্নিহিত কারণগুলি অনেকতা রোধ করতে সহায়তা করে। যেমন-

  • ইনসুলিন ইনজেকশনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করা 
  • কোলেস্টেরলযুক্ত উচ্চ খাবারগুলিকে বর্জন করা
  • হার্টের পক্ষে স্বাস্থ্যকর ডায়েট শুরু করা উচিত যাতে তাজা ফল, সবজি, গোটা দানা এবং কম ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে
  • অ্যালকোহল সেবন সীমাবদ্ধ
  • ধুমপান ত্যাগ করা 
  • শারীরিক পরিশ্রম বৃদ্ধি করা 
  • ওজন কমানো

কিডনির রোগকে কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?

কিডনি রোগের ঝুঁকির কিছু কারণ – যেমন বয়স বা পারিবারিক ইতিহাস – এগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। তবে কিডনি রোগ প্রতিরোধে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে:

  • পর্যাপ্ত পরিমানে জল পান করা উচিত 
  • ডায়াবেটিস হলে রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে 
  • রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত 
  • লবণ গ্রহণ কমাতে হবে 
  • ধুমপান ত্যাগ করতে হবে 
  • চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে কোন ওষুধ খেতে হবে
  • ওভার-দ্য কাউন্টার ওষুধগুলির জন্য নির্দিষ্ট ডোজের নির্দেশাবলী সর্বদা অনুসরণ করা উচিত। বেশি পরিমাণে অ্যাসপিরিন (বায়ার) বা আইবুপ্রোফেন (অ্যাডভিল, মোটরিন) খাওয়ার ফলে কিডনির ক্ষতি হতে পারে।

অতিরিক্ত সোডিয়াম আছে এমন খাবার সীমিত পরিমানে খাওয়া ভালো। প্যাকেট করা মাছ-মাংস, সাইট্রিক অ্যাসিড ও প্রিজারবেটিভ যুক্ত কমলা, লেবু এবং আঙ্গুরের রস, বিট, শাক, মিষ্টি আলু এবং চকোলেট (অক্সালেট থাকতে পারে) ইত্যাদি। ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের আগে চিকিৎসকের সাথে কথা বলতে হবে। কিছু ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট কিডনিতে পাথর সৃষ্টি করতে পারে। কিডনিকে ভালো রাখুন ও কিডনির রোগ প্রতিরোধে সচেতন হোন।

YouTube চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন
May be an image of 2 people and text

তথ্য সুত্রঃ 

  1. Thomas R, Kanso A, Sedor JR. Chronic kidney disease and its complications. Prim Care. 2008;35(2):329-vii. doi:10.1016/j.pop.2008.01.008
  2. Chen TK, Knicely DH, Grams ME. Chronic Kidney Disease Diagnosis and Management: A Review. JAMA. 2019;322(13):1294-1304. doi:10.1001/jama.2019.14745
  3. Breyer MD, Susztak K. Developing Treatments for Chronic Kidney Disease in the 21st Century. Semin Nephrol. 2016;36(6):436-447. doi:10.1016/j.semnephrol.2016.08.001
  4. Grill AK, Brimble S. Approach to the detection and management of chronic kidney disease: What primary care providers need to know. Can Fam Physician. 2018;64(10):728-735.
  5. Mullins LJ, Conway BR, Menzies RI, Denby L, Mullins JJ. Renal disease pathophysiology and treatment: contributions from the rat. Dis Model Mech. 2016;9(12):1419-1433. doi:10.1242/dmm.027276

Write your comments

%d bloggers like this: